• ঢাকা
  • শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৩:০৭ এএম


কুরবানির চামড়ার বাজারে ধসের আশঙ্কা, ক্ষতির মুখে কওমি মাদ্রাসা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৫ মে ২০২৬ ১১:০৫ পিএম

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী চামড়াশিল্প এখন গভীর সংকটে পড়েছে। কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠত, তা এখন প্রায় পঙ্গুত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তীব্র মূলধন সংকট, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যসহ নানা সমস্যায় দেশের অন্যতম প্রধান এই শিল্প খাত রক্ষায় ঈদের মাত্র দুই দিন আগেও কার্যকর তৎপরতার ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে।

চামড়ার বাজারে ধারাবাহিক অস্থিরতা ও বিপর্যয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, এতিম শিশু এবং কওমি মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলো। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশের ব্যয় নির্বাহ হয় কুরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ থেকে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লাখ লাখ এতিম শিক্ষার্থীর খাদ্য, বস্ত্র ও শিক্ষার ব্যয় সংকটে পড়তে পারে।

এদিকে কেউ কেউ মনে করছেন, এটি কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়; বরং কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও চামড়াশিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুরবানির কাঁচা চামড়ার বাজারে সম্ভাব্য ধসের পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো—তীব্র তারল্য সংকট ও ব্যাংকঋণের অপ্রতুলতা, সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর নানা সীমাবদ্ধতা, লবণ ও কেমিক্যালের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অজ্ঞতা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়ায় চামড়া ব্যবসায়ীরা নগদ অর্থ সংকটে রয়েছেন। কয়েক বছর ধরেই কাঁচা চামড়া কেনার জন্য ব্যাংকঋণ কমে যাচ্ছে। এ খাতের অধিকাংশ ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দিতে অনাগ্রহী।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের অজুহাতে অর্থ ছাড় করছে না। সাভারে স্থানান্তরের পর থেকেই অধিকাংশ ট্যানারি লোকসানে চলছে। আড়তদাররা টাকা না পেলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কেনে না। ফলে ঈদে চামড়ার বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, এ বছর চামড়া সংরক্ষণে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ২২৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকারও কম ঋণ বিতরণ হতে পারে।

চামড়াশিল্পের এ পরিস্থিতিকে শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে নারাজ দেশের অনেক আলেম ও সমাজবিজ্ঞানী। তাদের মতে, এর ফলে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ঢাকার দক্ষিণখানের দারুল আবরার মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা আবদুল হান্নান বলেন, চামড়াজাত পণ্যের দাম প্রতিবছর বাড়লেও কুরবানির চামড়ার দাম কমছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “এটা কীভাবে সম্ভব? পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন হয় কি না জানা নেই। এর পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও কারসাজি রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী কুরবানির চামড়া বা এর বিক্রয়লব্ধ অর্থ ব্যক্তি নিজে ভোগ করতে পারে না। এটি এতিম, মিসকিন ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের শিক্ষার্থীদের হক। অথচ সেই অধিকারই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশের চামড়ার বাজার দুর্বল হওয়ার পেছনে ভারতেরও একটি প্রভাব রয়েছে। কারণ, দেশে চামড়ার দাম কমে গেলে তা সীমান্তপথে অবৈধভাবে ভারতে পাচারের ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প যাতে ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে না পারে, সেজন্যও আন্তর্জাতিকভাবে একটি লবিং সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

খিলগাঁও গোড়ান বাজারের জামেয়া ইসলামিয়া ফজলুর রহমান ভূঁইয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার ইনচার্জ মাওলানা মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এখন মাদ্রাসার ছাত্ররা আর চামড়া সংগ্রহে যেতে চায় না। অনেক এতিমখানায় চামড়া সংগ্রহই বন্ধ হয়ে গেছে। এটা মাদ্রাসা শিক্ষাকে পিছিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।”

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের কওমি মাদ্রাসা, দারুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোর বার্ষিক বাজেটের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ অর্থ আসে কুরবানির চামড়া বিক্রি থেকে। এই অর্থ দিয়েই সারা বছর হাজার হাজার এতিম ও দুস্থ শিশুর খাবার, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় চালানো হয়। কিন্তু চামড়া খাতের এ সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়েছে।

এ অবস্থায় সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের সব জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পুলিশ প্রশাসনকে চামড়া নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি ঠেকাতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। একই সঙ্গে চামড়া পাচার রোধে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নজরদারি জোরদারের কথাও বলা হয়েছে।