• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম


ইসলামে ধ’র্ষণ প্রমাণে চার সাক্ষী লাগে না, বললেন জাকির নায়েক

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৫ জুন ২০২৬ ৯:৪৯ পিএম

বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এ ধরনের অপরাধের বিচার ও শাস্তি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেকেই ইসলামী শরিয়া আইনের প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেন, ধর্ষণ প্রমাণের জন্য ভুক্তভোগী নারীর চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করা বাধ্যতামূলক। এই ধারণা কতটা সঠিক— এমন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন আলোচিত ইসলামী বক্তা ডা. জাকির নায়েক।

আন্তর্জাতিক ইসলামি স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেট টেলিভিশন হুদা টিভির এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী দাবি করা এবং এরপর অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার বিধান কতটা যুক্তিযুক্ত।

জবাবে ডা. জাকির নায়েক বলেন, মুসলিম ও অমুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের মধ্যেই একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, ইসলামী আইনে ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী প্রয়োজন হয়। তার মতে, এটি সঠিক নয়। তিনি বলেন, মানুষ মূলত জিনা বা সম্মতিপূর্ণ অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগ প্রমাণের শর্তের সঙ্গে ধর্ষণের বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলেছে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ইসলামী শরিয়তে যদি কেউ কোনো নির্দোষ নারী বা পুরুষের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ তোলে, তাহলে অভিযোগকারীকে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করতে হবে। অন্যথায় অভিযোগকারী নিজেই ৮০ বেত্রাঘাতের শাস্তির মুখোমুখি হবে। তাই চার সাক্ষীর শর্তটি ব্যভিচারের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ধর্ষণের ক্ষেত্রে নয়।

জাকির নায়েক বলেন, জিনা ও ধর্ষণের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জিনা সংঘটিত হয় উভয় পক্ষের সম্মতিতে, কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে একজনের ওপর জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে এই দুই অপরাধকে একই মানদণ্ডে বিচার করা যায় না।

তিনি উল্লেখ করেন, ধর্ষণের মতো জোরপূর্বক অপরাধের ক্ষেত্রে ইসলামী আইনবিদরা পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করেন। সেখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং পৃথিবীতে ফাসাদ বা নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে মৃত্যুদণ্ড, ক্রুশবিদ্ধকরণ, বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে ফেলা অথবা নির্বাসনের কথা উল্লেখ রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামী আইনবিদদের অনেকেই ধর্ষণকে ‘হিরাবাহ’ বা সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অপরাধের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন। কারণ ধর্ষণের ক্ষেত্রেও ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হয়।

ডা. জাকির নায়েক বলেন, ধর্ষণের অভিযোগ যদি সুস্পষ্ট ও নির্ভুলভাবে প্রমাণিত হয়, তাহলে অপরাধীর জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ধরনের অপরাধ প্রমাণে চারজন সাক্ষীর প্রয়োজন নেই; বরং দুইজন সাক্ষী কিংবা পরিস্থিতিগত ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। বিচারক যদি সব তথ্য-প্রমাণ বিবেচনায় নিশ্চিত হন যে অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী, তবে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বিচারক যদি শতভাগ নিশ্চিত হতে না পারেন, তাহলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কারাদণ্ড, বেত্রাঘাত বা অন্য কোনো শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। তবে কোরআনে এ ধরনের অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির নির্দেশনা রয়েছে।

আলোচনায় তিনি ইসলামী আইনবিদদের বিভিন্ন মতামতের কথাও তুলে ধরেন। ইমাম মালেক (রহ.) ও ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মতে, ধর্ষককে নির্ধারিত শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগী নারীকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা মোহর প্রদান করতে হবে। অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও সুফিয়ান সাওরীর (রহ.) মতে, নির্ধারিত শাস্তিই যথেষ্ট। তবে ধর্ষণ প্রমাণে চারজন সাক্ষী আবশ্যক নয়— এ বিষয়ে সবাই একমত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জাকির নায়েক এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে সংঘটিত একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন, যা সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে। সেখানে এক নারী রাতে মসজিদে যাওয়ার পথে ধর্ষণের শিকার হন। পরে ভুলবশত একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হলেও প্রকৃত অপরাধী নিজেই সামনে এসে অপরাধ স্বীকার করে। এরপর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দোষ ব্যক্তিকে মুক্তি দেন এবং প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে শাস্তির নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন, এই ঘটনা থেকেও বোঝা যায় যে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণে চারজন সাক্ষী চাওয়া হয়নি। বরং পরিস্থিতিগত তথ্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতেই বিচার প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছিল।

সবশেষে ডা. জাকির নায়েক বলেন, ইসলামে ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী বাধ্যতামূলক—এ ধারণা ভুল। তার মতে, পারিপার্শ্বিক, পরিস্থিতিগত ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতেও অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব। তবে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের আগে অপরাধের বিষয়ে বিচারকের পূর্ণ নিশ্চয়তা থাকা আবশ্যক।

/এসএন