জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে ‘৩ কোটি টাকার ডিল’ করার অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার জেরে ছাত্রদল নেতা আব্দুল গাফফারের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাত সাড়ে ৮টার দিকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের পশ্চিম বড় দেইল গ্রামে গাফফারের পৈতৃক বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী আব্দুল গাফফার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তিনি হাতিয়া উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বড় দেইল গ্রামের বাসিন্দা এবং মাওলানা মোছলেহ উদ্দিনের ছেলে। গাফফারের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি হান্নান মাসউদের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।
ঘটনার পরপরই হাতিয়া উপজেলা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা স্থানীয় সাগরিয়া বাজারে বিক্ষোভ মিছিল করেন। হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদ জানিয়ে তারা ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
আব্দুল গাফফার বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হান্নান মাসউদ, রিফাত ও মাহিম সেফ হোমে ছিলেন। সে সময় তিনি নিজেই হান্নানকে নিরাপদে রাখার দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন ভিডিও ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন। তার দাবি, হাতিয়ার রাজনীতিতে হান্নান মাসউদের অবস্থান তৈরিতে তিনি ভূমিকা রেখেছেন এবং ৫ আগস্টের পর প্রায় দেড় মাস তার রাজনৈতিক গার্ডিয়ান হিসেবে পাশে ছিলেন।
গাফফারের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয় এবং এ জন্য ৩ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল। তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, গত বুধবার (৩ জুন) গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান বিএনপি নেতা মুহাম্মদ রাশেদ খাঁনের কাছে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন। পরে রাশেদ খাঁন বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন, যা তিনি নিজের ফেসবুক আইডি থেকে শেয়ার করেন।
গাফফারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর থেকেই হান্নান মাসউদ তার ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং তার অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও গালাগাল করতে থাকে। তিনি বলেন, বিষয়টি হান্নান মাসউদকে জানালে তিনি নাকি বলেন, ওই ব্যক্তিরা তার নিয়ন্ত্রণে নেই এবং তারা তার কথা শোনে না।
গাফফারের অভিযোগ, সাবেক এমপি একরামুল করিম চৌধুরীকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে ৩ কোটি টাকা দাবির তথ্য প্রকাশ্যে আসার জেরেই তার বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীরা বাড়ির ভবন, জানালা ও প্রধান ফটকে ভাঙচুর চালায় এবং অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করে চলে যায় বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, তার বৃদ্ধ মা জান্নাত আরা বেগম (৬০) ও বাবা মোছলেহ উদ্দিন (৬৯) বাড়িতে একা থাকেন। ঘটনার পর তারা আতঙ্কিত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং এখনও ভয়ের মধ্যে রয়েছেন। তার ভাষায়, পরিবারের সদস্যরা তাকে এ বিষয়ে আর কোনো বক্তব্য না দেওয়ার অনুরোধ করছেন।
হাতিয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রিয়াজ মাহমুদ বলেন, আওয়ামী লীগ নেতাকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে ৩ কোটি টাকা দাবির অভিযোগ প্রকাশের পর গত দুদিন ধরে গাফফারকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তার দাবি, যারা হুমকি দিয়েছে তারাই হামলার সঙ্গে জড়িত।
অন্যদিকে হাতিয়া উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক সামছুল তিবরিজ বলেন, গাফফার দৃঢ়ভাবে দাবি করছেন যে এনসিপির নেতাকর্মীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তার ভাষায়, যদি এমন অভিযোগ করা হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে তারা নিজেরাই ভাইরাল হওয়ার জন্য এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছ থেকে বিষয়টি জানার পর তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে বিএনপির নেতাকর্মীরা একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন বলেও অভিযোগ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমার নিজের বাড়িতে হামলা হয়। আমি সেগুলো ট্যাকেল দিয়ে উঠতে পারিনা, আমি আরেকজনের বাড়িতে হামলা করব কীভাবে? এটা পুরোপুরি একটা সাজানো নাটক করা হয়েছে, যাতে করে আমাকে হেয় করা যায়। চেষ্টা করে যাক, দেখা যাক কী করতে পারে।”
এদিকে হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন জানিয়েছেন, এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
/এসএন