• ঢাকা
  • শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৪:৫৮ এএম


সতর্ক করল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ ‘উচ্চ ঝুঁকিতে’

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ৯:১৮ পিএম

বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি দেশব্যাপী পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। দেশের বেশিরভাগ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, বিপুলসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া এবং টিকাদানে ঘাটতির কারণে এই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় ইতোমধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়েছে, যা মোট জেলার প্রায় ৯১ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে এবং এপ্রিল নাগাদ তা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছায়। ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি (আইএইচআর) ফোকাল পয়েন্ট এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করে।

১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৯০০-এর বেশি। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতির গুরুতর দিক তুলে ধরে।

সংক্রমণের সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা যাচ্ছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি। এর পাশাপাশি রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোতে সংক্রমণের হার বেশি দেখা যাচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রান্তদের বড় একটি অংশই শিশু। হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুর বয়স দুই বছরের নিচে, এমনকি নয় মাসের কম বয়সি শিশুও আক্রান্ত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এসব শিশু টিকা পায়নি বা সম্পূর্ণ টিকাদান সম্পন্ন হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাদুর্ভাবের একটি বড় কারণ টিকাদানে ঘাটতি। সাম্প্রতিক সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন এবং জাতীয় পর্যায়ে সম্পূরক টিকাদান কার্যক্রমের অভাবের কারণে অনেক শিশু সুরক্ষার বাইরে থেকে গেছে। ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ভাইরাস সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমণের পর সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

যদিও অনেক ক্ষেত্রে রোগটি নিজে নিজেই সেরে যায়, তবে এটি গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এবং এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের টিকার আওতায় আনা হচ্ছে এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকায় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি সন্দেহভাজন রোগীদের ভিটামিন ‘এ’ প্রদান এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টিকাদান কভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশে উন্নীত করার ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি এবং সীমান্ত এলাকায় বিশেষ সতর্কতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে সংক্রমণ আরও বিস্তার লাভ না করে।

সার্বিকভাবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হামের সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।