• ঢাকা
  • রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম


কোরবানির হাটে ‘অস্বাভাবিক মোটাতাজা’ গরু: লাভের দৌড়ে কি ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য?

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৬ মে ২০২৬ ৭:৩২ পিএম

কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে এলেই দেশের পশুর হাটগুলোতে চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির, অস্বাভাবিকভাবে মোটাতাজা গরুর উপস্থিতি। চকচকে শরীর, ফুলে ওঠা মাংসপেশি আর দ্রুত ওজন বাড়ানো এসব পশু নিয়ে প্রতি বছরই সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। অনেকেই জানতে চান—এসব গরু কতটা প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা হয়েছে, আর কতটা কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা হয়েছে?

পশুসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরু মোটাতাজাকরণ নিজেই নেতিবাচক কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের খামারিরা ভুসি, খৈল, ঘাস, ভুট্টা ও সুষম দানাদার খাদ্য ব্যবহার করে গরুকে স্বাস্থ্যবান করে তুলছেন। এটি একটি স্বাভাবিক ও বৈজ্ঞানিক খামার ব্যবস্থাপনার অংশ।

তবে সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন অল্প সময়ে বেশি লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী শর্টকাট পদ্ধতির আশ্রয় নেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, তখনই গরু মোটাতাজাকরণে অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে।

গত কয়েক দশকে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও প্রচারণায় ইউরিয়া মিশ্রিত খড়, দ্রুত ওজন বাড়ানোর ফিড এবং নিবিড় মোটাতাজাকরণ পদ্ধতির ব্যাপক প্রচার দেখা গেছে। যদিও এসব ধারণার কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, তবু পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া মাঠপর্যায়ে এর অপব্যবহার শুরু হয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

তাদের মতে, ধীরে ধীরে কিছু খামারি স্টেরয়েড, ক্ষতিকর ইনজেকশন এবং অতিরিক্ত রুচিবর্ধক ওষুধ ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এতে গরুর শরীরে দ্রুত পরিবর্তন এলেও দীর্ঘমেয়াদে পশুর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্টেরয়েডজাত ওষুধ ব্যবহারের ফলে গরুর শরীরে অস্বাভাবিক পানি জমা হতে পারে। পাশাপাশি লিভার ও কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। অনেক সময় পশু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক চলাফেরায় সমস্যাও দেখা দেয়। বাইরে থেকে গরুকে সুস্থ ও মোটাতাজা মনে হলেও ভেতরে জটিল শারীরিক সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও পরিষ্কার করে বলছেন, সব বড় আকারের গরুই ক্ষতিকর বা ওষুধনির্ভর নয়। উন্নত জাত, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং বৈজ্ঞানিক খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও গরু স্বাভাবিকভাবে বড় ও শক্তিশালী হতে পারে। তাই শুধুমাত্র গরুর আকার দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তার আচরণ, হাঁটার ধরন, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং স্বাভাবিক সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, প্রাণীর খাদ্য ও ওষুধে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যদিও “গরুর মাংস খেলেই সরাসরি ক্যান্সার বা কিডনি রোগ হয়”—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তবুও অনিরাপদ ওষুধ ব্যবহারের সম্ভাব্য ক্ষতি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

কোরবানির পশু কেনার সময় ক্রেতাদের সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে—

১. অস্বাভাবিক ফোলা বা শরীরে পানি জমা মনে হয় এমন গরু এড়িয়ে চলা উচিত।

২. হাঁটতে কষ্ট হয় বা অত্যন্ত দুর্বল দেখায়—এমন পশু না কেনাই ভালো।

৩. পরিচিত ও বিশ্বস্ত খামার থেকে পশু কেনার চেষ্টা করা উচিত।

৪. সন্দেহ হলে অবশ্যই ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

৫. শুধু আকার নয়, পশুর সামগ্রিক সুস্থতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত লাভের প্রতিযোগিতায় যেন খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে এখনই গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তাদের ভাষ্য, সচেতন ক্রেতা, দায়িত্বশীল খামারি এবং কার্যকর সরকারি তদারকির সমন্বয়েই কোরবানির হাটে নিরাপদ পশু ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব।