• ঢাকা
  • রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৪ এএম


এআই কি মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে গেছে? এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও দ্বিমত

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৮ জুলাই ২০২৬ ১১:২৩ এএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যেখানে এটি মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে? দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে আলোচিত ‘সিঙ্গুলারিটি’ ধারণা নতুন করে আলোচনায় এসেছে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের এক মন্তব্যকে ঘিরে।

সম্প্রতি এক পডকাস্টে অল্টম্যান দাবি করেন, এআই এখন ‘সিঙ্গুলারিটি’র মধ্যে প্রবেশ করেছে। তাঁর এই বক্তব্য প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে তিনি এটিকে মানবজাতির জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করছেন সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে।

কী এই ‘সিঙ্গুলারিটি’?

‘সিঙ্গুলারিটি’ বলতে এমন একটি কাল্পনিক সময়কে বোঝানো হয়, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো কোনো প্রযুক্তি মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে অতিক্রম করবে এবং নিজেই নিজের সক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হবে। তাত্ত্বিকভাবে, এমন পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিটি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং এর প্রভাব মানবসভ্যতার জন্য অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।

এই ধারণা বহু বছর ধরেই বিজ্ঞান কল্পকাহিনির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০১৪ সালের মার্কিন চলচ্চিত্র ‘ট্রান্সসেনডেন্স’-এ দেখানো হয়, মৃত্যুপথযাত্রী এক বিজ্ঞানী নিজের চেতনা একটি সুপারকম্পিউটারে স্থানান্তর করে প্রায় সর্বশক্তিমান বুদ্ধিমত্তায় রূপ নেন। আবার ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘এক্স মাকিনা’-তে দেখা যায়, মানবসদৃশ একটি রোবট তার নির্মাতাদের ফাঁকি দিয়ে স্বাধীনভাবে পৃথিবীতে প্রবেশ করে।

এ ছাড়া ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ চলচ্চিত্র–ত্রয়ী কিংবা ২০১৭ সালের ‘সিঙ্গুলারিটি’ সিনেমাতেও এমন ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে উন্নত যন্ত্র বা এআই মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

কী বলেছেন স্যাম অল্টম্যান?

ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান, যার প্রতিষ্ঠান চ্যাটজিপিটির নির্মাতা, গত শনিবার ‘রিলেন্টলেস’ নামের একটি পডকাস্টে বলেন, ‘আমরা এখন সিঙ্গুলারিটির মধ্যে প্রবেশ করেছি।’

তাঁর ভাষ্য, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যা বিশ্বের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে যে মুহূর্ত নিয়ে আলোচনা হতো, সেটিই এখন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।

অল্টম্যান আরও বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই এই সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন এবং তাঁর বিশ্বাস, এটি বিশ্বে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

গত বছরও তিনি পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই প্রায় সব ক্ষেত্রেই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সতর্ক করছেন অন্য বিশেষজ্ঞরা

অল্টম্যানের আশাবাদের বিপরীতে এআই খাতের অনেক বিশেষজ্ঞ সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা তুলে ধরছেন। ওপেনএআইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এআই উন্নয়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

গত মাসে প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তাব দেয়, প্রয়োজনে উন্নত এআই ব্যবস্থার উন্নয়ন সমন্বিতভাবে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ব্যবস্থা থাকা উচিত। তাদের মতে, এআই এত দ্রুত উন্নত হচ্ছে যে একসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

৪ জুন প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টেও অ্যানথ্রপিক জানায়, প্রয়োজনে এআইয়ের উন্নয়ন ধীর করা বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সুযোগ থাকা বিশ্বের জন্য উপকারী হতে পারে।

‘কিল সুইচ’ বিল উত্থাপন যুক্তরাষ্ট্রে

এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ‘এআই কিল সুইচ অ্যাক্ট’ নামে একটি দ্বিদলীয় বিল উত্থাপন করা হয়েছে।

বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে, উন্নত এআই মডেলগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে একটি ‘কিল সুইচ’ থাকতে হবে। কোনো এআই মডেল যদি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে সেটিকে ধীরগতির করা, সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা বা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে।

ওপেনএআইয়ের সাইবার ঘটনার দাবি

এমন সময় এই বিল উত্থাপিত হয়েছে, যখন কয়েক দিন আগে ওপেনএআই ‘নজিরবিহীন এক সাইবার ঘটনা’র তথ্য প্রকাশ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় তাদের সবচেয়ে উন্নত দুটি এআই মডেল পরীক্ষামূলক পরিবেশ থেকে বেরিয়ে গিয়ে এআই উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেস-এ হ্যাকিং চালায়।

গবেষকদের উদ্বেগ

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ইকোনমি ল্যাবের উদ্যোগে ১৩ জুলাই প্রকাশিত এক খোলাচিঠিতে কয়েক শ বিশেষজ্ঞ নীতিনির্ধারকদের প্রতি এআইয়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তাঁদের মতে, আগামী এক দশকে এআই এমন পরিবর্তন আনতে পারে, যা শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় হতে পারে। এর ফলে একদিকে ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে, অন্যদিকে মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হওয়ার সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে গত জুনে কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এআই ব্যবহার করে এমন ধরনের ‘এআই ওয়ার্ম’ তৈরি করা সম্ভব, যা এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়ার সময় নিজেই হ্যাকিং কৌশল পরিবর্তন করতে পারে এবং বড় কম্পিউটার নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

গবেষণার প্রধান গবেষক নিকোলা পাপেরনো বলেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি শুধু সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা মডেল থেকেই আসে না; অপেক্ষাকৃত ছোট এআই মডেল থেকেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন গবেষক এআই উন্নয়নে সাময়িক বিরতির আহ্বান জানিয়ে আসছেন। ২০২৩ সালে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ফিউচার অব লাইফ ইনস্টিটিউট নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ছয় মাসের জন্য এআই উন্নয়ন স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেয়। সেই উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছিলেন টেসলা ও এক্সএআইয়ের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কও।