শিক্ষামন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোর সচেতনতামূলক বার্তার পরও এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগ থামছে না। নিয়ম অনুযায়ী কেবল অনুমোদিত পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও, বাস্তবে অনেক পরীক্ষক শিক্ষার্থী ও কিশোরদের দিয়ে সেই কাজ করিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি নম্বর গণনা ও ওএমআর শিটের বৃত্ত ভরাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও অননুমোদিত ব্যক্তিদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিও ও ছবিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফেসবুক ও টিকটকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, পরীক্ষকের পরিবর্তে তার ছাত্র বা পরিচিত তরুণরা উত্তরপত্র নিয়ে বসে খাতা পড়ছে, নম্বর দিচ্ছে এবং ওএমআর শিট পূরণের কাজ করছে। কেউ কেউ আবার এসব ভিডিও নিজেদের প্রোফাইলে বিভিন্ন ক্যাপশন দিয়ে পোস্ট করেছেন।
গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন, নম্বর যোগ এবং বৃত্ত ভরাট সংক্রান্ত অন্তত আটটি ভিডিও ও রিলস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওগুলোর কিছুতে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, যশোর ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের খাতা দেখা গেছে। এছাড়া ঢাকা বোর্ড ও কুমিল্লাসহ কিছু বোর্ডের ২০২৫ কিংবা তারও আগের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ভিডিও নতুনভাবে প্রচার করে ট্রেন্ড তৈরি করা হয়েছে।
এসব ভিডিওতে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন চটকদার ক্যাপশনও। কিছু টিকটক ভিডিওতে লেখা হয়েছে— “সবার সাথে বসে এসএসসি পরীক্ষার খাতা দেখলাম”, “২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী, কে কে আছো কমেন্টে জানাও”, “এখানে কার কার ভবিষ্যৎ আছে কমেন্ট করে জানাও” ইত্যাদি।
কেন এই স্পর্শকাতর দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের হাতে যাচ্ছে, তা নিয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর কয়েকজন পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক স্বীকার করেছেন, খাতা মূল্যায়নে এ ধরনের অনিয়ম ঘটে থাকে। তাদের ভাষ্য, সময়ের চাপ, অবহেলা এবং বাড়তি আয়ের লোভ থেকেই কিছু শিক্ষক এই পথে হাঁটেন।
এক পরীক্ষক জানান, অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হাতে একটি ‘মডেল উত্তরপত্র’ ধরিয়ে দিয়ে সেই অনুযায়ী নম্বর দিতে বলেন। কিন্তু সৃজনশীল প্রশ্নের ভিন্নধর্মী উত্তর মূল্যায়নের মতো অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা শিক্ষার্থীদের থাকে না। ফলে যারা নিজের ভাষায় বা ব্যতিক্রমীভাবে উত্তর লেখে, তারা কম নম্বর পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
রাজধানীর একটি স্কুলের এক সিনিয়র শিক্ষক, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বোর্ডের খাতা মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত, জানান— নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একজন পরীক্ষককে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ খাতা দেখতে হয়। পাশাপাশি অনেক শিক্ষক কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনি নিয়েও ব্যস্ত থাকেন। এজন্য তারা অনেক সময় নিজেদের বিশ্বস্ত ছাত্র বা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া পরিচিতদের দিয়ে খাতা মূল্যায়নের কাজ করিয়ে নেন। পরে শুধু নম্বর যাচাই করে স্বাক্ষর করে দেন।
আরেক পরীক্ষক বলেন, খাতা মূল্যায়নের চেয়েও বেশি অনিয়ম ঘটে নম্বর গণনা ও ওএমআর শিট পূরণের ক্ষেত্রে।
ময়মনসিংহ বোর্ডের এক পরীক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক শিক্ষক মনে করেন নম্বর যোগ করা বা বৃত্ত ভরাট কেবল যান্ত্রিক কাজ। তাই তারা নিজেদের সন্তান বা স্কুলের শিক্ষার্থীদের দিয়ে এসব করিয়ে নেন। অথচ সামান্য ভুলও একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো গোপনীয়তা লঙ্ঘন। একটি খাতা যখন শিক্ষকের ড্রয়িংরুম বা ক্লাসরুমে উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে, তখন সেটি আর নিরাপদ থাকে না। যারা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিচ্ছে, তারা হয়তো বুঝতেই পারছে না তারা কত বড় অপরাধ করছে। আর এই সুযোগ করে দিচ্ছেন খোদ শিক্ষকরাই।
এদিকে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০’ অনুযায়ী, বোর্ড কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত পরীক্ষক ছাড়া অন্য কেউ পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে পারবেন না। আইনের ৪২ এর ১০ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা বোর্ড কর্তৃক নিযুক্ত বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত না হয়েও কেউ যদি পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অপরাধে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিন বলেন, খাতা মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ আসেনি। তিনি বলেন, অনেক সময় পুরোনো ভিডিও নতুন করে প্রচার করা হয়। তাই যাচাই ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
তিনি আরও জানান, খাতা মূল্যায়নে কঠোর গোপনীয়তা নীতিমালা অনুসরণ করা হয় এবং পরীক্ষকদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে— অন্য কাউকে দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন বা নম্বর দেওয়ার সুযোগ নেই। কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে পুলিশ, ডিজিএফআই, এনএসআই কিংবা বোর্ডের নিজস্ব তদন্ত টিমের মাধ্যমে তদন্ত করা হবে।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জি. এম. শহীদুল ইসলামও বলেন, তাদের নজরে এখন পর্যন্ত এমন কোনো ভিডিও আসেনি। তবে বিষয়টি ফেকও হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, পরীক্ষকদের শুরু থেকেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন খাতা কোথাও প্রকাশ্যে নেওয়া না হয় এবং সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নসংক্রান্ত কোনো ভিডিও বা অভিযোগ এখনো বোর্ডের দৃষ্টিগোচর হয়নি।
অন্যদিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এছাড়া আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
/এসএন