ফুটবল ইতিহাসে সময়ে সময়ে এমন কিছু বিস্ময় বালকের আবির্ভাব ঘটে, যারা নিজেদের প্রতিভা আর পায়ের জাদুতে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেন। পেলে, দিয়েগো ম্যারাডোনা কিংবা লিওনেল মেসিদের পর সেই তালিকায় নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছেন স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল।
২০২৪ সালে স্পেন যখন ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে, তখন ইয়ামালের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। ফ্রান্সের বিপক্ষে ইউরোর সেমিফাইনালে তার অবিশ্বাস্য দূরপাল্লার গোল এখনো ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। তাই প্রশ্ন উঠছে, ২০১০ সালের পর আবারও কি বিশ্বকাপ ট্রফি স্পেনের হাতে তুলে দিতে পারবেন ১৯ বছর বয়সী এই বিস্ময় বালক?
কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন এখন আর পুরোনো ধীরগতির ‘টিকিটাকা’ নির্ভর দল নয়। বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও তাদের আক্রমণের ধরন এখন অনেক বেশি দ্রুত, ধারালো এবং গতিময়। ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলা স্পেনের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তাদের চলমান কাঠামোতে। বিল্ডআপে তিন ডিফেন্ডারের সঙ্গে রদ্রি কিংবা মার্টিন জুবিমেন্দির মতো ডিপ মিডফিল্ডার থাকেন। এরপর পজিশন পরিবর্তন, অবিরাম রোটেশন এবং ওয়ান-টাচ পাসিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ভুল জায়গায় টেনে এনে আক্রমণ গড়ে তোলে দলটি। যেন দাবার বোর্ডে ধীরে ধীরে সাজানো এক নিখুঁত চেকমেট।
মিডফিল্ডে রদ্রি, পেদ্রি, জুবিমেন্দি, ফ্যাবিয়ান রুইজ, গাভি, মিকেল মেরিনো এবং দানি ওলমোর মতো প্রতিভাবান ফুটবলারের সঙ্গে আছেন লামিন ইয়ামাল। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাছে তিনি যেন এক অসমাপ্ত ধাঁধা। ডান প্রান্তে শুরু করলেও কখনো টাচলাইনে থাকেন, কখনো হাফ স্পেসে ঢুকে পড়েন, আবার কখনো ভেতরে কাট করে হঠাৎ শট নিয়ে বিপদ তৈরি করেন।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১০ ম্যাচে ৬ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট তার সামর্থ্যেরই প্রমাণ। তবে পরিসংখ্যানের বাইরেও ইয়ামালের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার উপস্থিতিই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের পরিকল্পনা বদলে দিতে পারে। শুধু ড্রিবলিং নয়, তার ফুটবল বুদ্ধিমত্তাও তাকে আলাদা করেছে।
২০১০ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর গত তিনটি বিশ্বকাপে স্পেনের টিকিটাকা কৌশল প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের সামনে গিয়ে অনেক সময় কার্যকারিতা হারিয়েছে। অসংখ্য পাস দিয়েও প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভাঙতে পারেনি তারা। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে লামিন ইয়ামাল হয়ে উঠতে পারেন দলের ‘বাজির ঘোড়া’। ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে রক্ষণ ভেঙে ফেলার তার দক্ষতাই স্পেনকে অন্য দলগুলোর তুলনায় বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যদি স্পেনের মাঝমাঠ পথ খুঁজে না পায়, তবে কোনো এক জাদুকরী মুহূর্তেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারেন এই তরুণ তারকা।
ফুটবল কখনোই একজনের খেলা নয়। ইতিহাস বলছে, প্রতিটি বিশ্বকাপজয়ী দলেরই একজন ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ থাকে, থাকে একজন ‘বাজির ঘোড়া’। ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের সেই বিশেষ অস্ত্র হয়ে উঠবেন কি লামিন ইয়ামাল?
এর উত্তর সময়ই দেবে। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে কোটি কোটি দর্শকের চোখ যে এই খুদে জাদুকরের দিকেই থাকবে, তা বলাই যায়।