‘টাকা কড়ি ধন-সম্পত্তি, অনেক অনেক বাড়ি-গাড়ি… মরলে সঙ্গে যাবে না কোনই কিছুই… ঠিকানা শুধু এক সমাধি সাড়ে তিন হাত মাটি’—গানের এই কথাগুলো যেমন জীবনের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে, তেমনি পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতাও প্রিয়জনের স্মৃতিকে আগলে রাখার আবেগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রাজধানী ঢাকাতেও এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা প্রিয়জনের শেষ স্মৃতিচিহ্ন ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’ সংরক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে দ্বিধা করেন না।
রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার মতো অর্থ ব্যয় করেও অনেকে প্রিয়জনের কবর সংরক্ষণ করছেন। পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তানসহ স্বজনদের স্মৃতি ধরে রাখতে ১৫ থেকে ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিচ্ছেন তারা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় একটি কবর সংরক্ষণে সর্বোচ্চ ব্যয় হয় দেড় কোটি টাকা। আর এই খাত থেকে গত ছয় বছরে ডিএনসিসির আয় হয়েছে প্রায় ৫৩ দশমিক ৪৭ কোটি টাকা।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা যায়, তাদের আওতায় মোট ছয়টি কবরস্থান রয়েছে। এগুলো হলো বনানী, উত্তরা ৪, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টরের তিনটি কবরস্থান, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এবং রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থান। এসব কবরস্থানে সাধারণ ও সংরক্ষিত এলাকা আলাদাভাবে নির্ধারিত থাকে। মোট জমির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষিত কবরের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়।
সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিয়ে নির্ধারিত ফি পরিশোধের মাধ্যমে এসব কবরস্থানে প্রিয়জনের কবর দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা যায়। ২০২২ সালের নীতিমালা অনুযায়ী বর্তমানে ১৫ ও ২৫ বছরের জন্য কবর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। এর আগে ১০, ১৫, ২০ ও ২৫ বছরের মেয়াদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল।
নীতিমালা অনুযায়ী, বনানী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য এক কোটি এবং ২৫ বছরের জন্য দেড় কোটি টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে যথাক্রমে ৭৫ লাখ ও এক কোটি টাকা, উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ৫০ লাখ ও ৭৫ লাখ টাকা এবং উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকা ফি দিতে হয়। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে এই ব্যয় ২০ লাখ ও ৩০ লাখ টাকা এবং রায়েরবাজার কবরস্থানে ১০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা।
সাধারণ এলাকায় দাফন করা কোনো কবর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির তিন গুণ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এসব কবরের দৈর্ঘ্য ৮ ফুট, প্রস্থ ৪ ফুট এবং উচ্চতা সর্বোচ্চ ৩ ফুট নির্ধারণ করা হয়েছে।
নীতিমালায় আরও উল্লেখ রয়েছে, সংরক্ষিত কবরে শুধু পরিবারের পুত্র-কন্যা, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা ও সহোদর ভাই-বোনকে পুনঃদাফনের সুযোগ থাকবে। পুনঃকবরের জন্য বনানীতে ৫০ হাজার ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য কবরস্থানে ৩০ হাজার ৫০০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া স্থায়ীকরণের দুই বছর আগে নতুন করে পুনঃদাফন করা যাবে না, সংরক্ষিত কবরের বরাদ্দ হস্তান্তর করা যাবে না এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়ন না করলে বরাদ্দ বাতিল হয়ে যাবে। এক বা একাধিক শর্ত লঙ্ঘন হলেও অনুমোদন বাতিল হতে পারে।
ডিএনসিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় অর্থবছরে কবর সংরক্ষণ, দাফন ও পুনঃকবর বাবদ মোট ৫৩ দশমিক ৪৭ কোটি টাকা আয় হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৫ দশমিক ২১ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৫৭ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২৯ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ দশমিক ১২ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৩৬ কোটি এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৯২ কোটি টাকা আয় হয়েছে।
জানা গেছে, প্রতি তিন মাস পরপর সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে কবর স্থায়ীকরণের আবেদন নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আবেদন অনুমোদনের পর মৃত ব্যক্তির স্বজনদের নির্ধারিত অর্থ পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দেওয়ার সময় দেওয়া হয়। এরপর ডিএনসিসি কবর সংরক্ষণের অনুমতি দেয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে অনুমতি পেলেও মৃত ব্যক্তির স্বজনরা পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করেন না।
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, গত ছয় বছরে কতটি কবর স্থায়ীকরণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেই সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বের করা কঠিন। কারণ এ সংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট কবরস্থানগুলো সংরক্ষণ করে। তবে তিনি জানান, গত ছয় বছরে এ খাত থেকে ডিএনসিসির মোট আয় হয়েছে ৫৩ দশমিক ৪৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে পুনঃকবরের ফিও অন্তর্ভুক্ত।
/এসএন