ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু গোল, উত্তেজনা আর তারকাদের নৈপুণ্যের আসর নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কঠোর নিয়ম-কানুনও। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা, আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি) এবং বিশ্ব ডোপবিরোধী সংস্থা (ওয়াডা) টুর্নামেন্ট চলাকালে খেলোয়াড়দের আচরণ, পোশাক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার থেকে শুরু করে মাঠের বাইরের কার্যক্রম পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে থাকে।
ম্যাচ চলাকালে খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ন্ত্রণে আইএফএবির নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন রেফারিরা। গোল উদযাপনের সময় জার্সি খুলে ফেললে, ইচ্ছাকৃতভাবে সময় নষ্ট করলে কিংবা গ্যালারির দর্শকদের উসকানিমূলক আচরণ করলে সঙ্গে সঙ্গেই হলুদ কার্ড দেখানো হবে।
একইভাবে ফাউলের শিকার না হয়েও ফাউলের ভান করা বা পেনাল্টি আদায়ের আশায় পেনাল্টি বক্সে ‘ডাইভ’ দিলে সেটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এমন ঘটনায় সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখানো হবে। এছাড়া রেফারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক আচরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা গালিগালাজ করলে হলুদ কিংবা সরাসরি লাল কার্ড পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
টুর্নামেন্টে পৃথক দুটি ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড পেলে পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট ফুটবলারকে। অন্যদিকে লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়তে গড়িমসি করলে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়তে পারেন খেলোয়াড়রা।
মাঠে নামার আগে খেলোয়াড়দের পোশাক ও ব্যক্তিগত সরঞ্জাম নিয়েও রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম। নিরাপত্তার কারণে আংটি, গলার চেইন, ব্রেসলেট কিংবা ঘড়ির মতো যেকোনো ধরনের গয়না পরে মাঠে নামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে ম্যাচ রেফারি ও দলীয় চিকিৎসকের অনুমোদন থাকলে ব্যান্ডেজ, ফেস মাস্ক বা বিশেষ সুরক্ষামূলক গার্ড ব্যবহার করা যাবে।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, মূল জার্সি বা ভেতরের গেঞ্জিতে কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা ব্যক্তিগত বার্তা বা স্লোগান প্রদর্শন করা যাবে না। তবে ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে জার্সি বিনিময়ের ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুমোদিত রয়েছে। এছাড়া ফিফার পূর্বানুমতি সাপেক্ষে বর্ণবাদবিরোধী কর্মসূচি, যেমন হাঁটু গেড়ে বসার মতো উদ্যোগে অংশ নিতে পারে দলগুলো।
মাঠের বাইরেও খেলোয়াড়দের ওপর কঠোর নজরদারি থাকে। বিশ্বকাপ চলাকালে ম্যাচ শেষে, অনুশীলনের সময় কিংবা টিম হোটেলে অবস্থানকালেও ওয়াডা ও ফিফার প্রতিনিধিরা হঠাৎ ডোপ টেস্টের জন্য ডাকতে পারেন। ডোপ টেস্টে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানো কিংবা নমুনা নিয়ে কারসাজির চেষ্টা করলে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের স্বাধীনতা থাকলেও বর্ণবাদী, আপত্তিকর বা রাজনৈতিক উসকানিমূলক কোনো পোস্ট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ কারণে অনেক দল নিজেদের খেলোয়াড়দের অনলাইন কার্যক্রমও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
ফিফার নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন ও অফিসিয়াল মিডিয়া সেশনে অংশগ্রহণ খেলোয়াড়দের জন্য বাধ্যতামূলক। যথাযথ অনুমতি ছাড়া এসব কার্যক্রম এড়িয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হতে পারে।
এছাড়া অফিসিয়াল অনুষ্ঠানে অননুমোদিত স্পনসর বা প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো ব্র্যান্ডের প্রচারণাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যাতায়াতের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিধিনিষেধ। ক্যাম্প বা হোটেলের বাইরে যেতে হলে কোচিং স্টাফ ও টিম ম্যানেজমেন্টের আগাম অনুমতি নিতে হয় এবং যাতায়াতের জন্য ফিফা নির্ধারিত অফিসিয়াল যানবাহন ব্যবহার করতে হয়।
বিশ্বকাপের শৃঙ্খলা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং স্পনসরদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য এসব নিয়ম কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের নিয়ম মেনেও নিজেদের আচরণ পরিচালনা করতে হয়।
/এসএন