ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের পবিত্র আরাফাত ময়দানের নামিরাহ মসজিদ থেকে মঙ্গলবার (২৬ মে) হজের খুতবা প্রদান করেছেন মসজিদে নববির ইমাম ও খতিব শেখ আলী বিন আবদুর রহমান হুজাইফি। বিকাল সোয়া ৩টায় খুতবাটি বিশ্বব্যাপী একযোগে সম্প্রচার করা হয়।
আরবি ভাষায় প্রদত্ত ঐতিহাসিক এ খুতবায় মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, তাওহীদের গুরুত্ব, হজের পবিত্রতা রক্ষা এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়।
খুতবার শুরুতেই আল্লাহ তাআলার সর্বময় ক্ষমতা ও মহিমা বর্ণনা করে পবিত্র কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। এতে মানব ইতিহাসে জালিম ও পাপাচারী জাতিগুলোর ধ্বংসের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে মানবজাতিকে হজের আহ্বান জানানোর জন্য আল্লাহর নির্দেশের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।
খুতবায় বলা হয়, হজের মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা এবং সব ধরনের শিরক থেকে দূরে থাকা। শেখ আলী বিন আবদুর রহমান হুজাইফি জোর দিয়ে বলেন, হজের পবিত্র পরিবেশকে ঝগড়া-বিবাদ, অশ্লীলতা ও গুনাহের কাজ থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
বিশেষভাবে তিনি বলেন, হজের মাঠে কোনো ধরনের রাজনৈতিক স্লোগান বা দলীয় আহ্বান জানানো যাবে না। হজ হলো সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ, তার আনুগত্য করা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করার ইবাদত।
খুতবায় আরও বলা হয়, আরাফাতের ময়দানে ভাষা, বর্ণ ও দেশের ভিন্নতা থাকলেও মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি হয়। হাজিদের নিজেদের আচরণে ‘ইহসান’ বা উত্তম চরিত্র প্রকাশের আহ্বান জানানো হয় এবং মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়।
আরাফাতের দিনের গুরুত্ব তুলে ধরে খুতবায় বলা হয়, এই দিনেই আল্লাহ তাআলা দ্বীন ইসলামকে পরিপূর্ণ করার এবং মুসলমানদের ওপর নেয়ামত সম্পূর্ণ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর হাজিদের রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায়ের নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকার আহ্বান জানানো হয়।
খুতবায় হজের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কেও বিস্তারিত স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। সূর্যাস্তের পর মুজদালিফায় যাত্রা, পরবর্তী দিনগুলোতে মিনায় অবস্থান, জামারাতে শয়তানকে উদ্দেশ করে পাথর নিক্ষেপ, কোরবানি, মাথা মুণ্ডন এবং কাবা শরিফে বিদায়ী তাওয়াফের বিষয়গুলো হাজিদের সামনে তুলে ধরা হয়।
একই সঙ্গে হজের প্রতিটি ধাপ পালনের সময় শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তাড়াহুড়ো, ধাক্কাধাক্কি বা বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে চলতে এবং শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশনা ও নির্ধারিত রুট ম্যাপ মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
খুতবায় আরাফাতের দিনের দোয়ার ফজিলতও তুলে ধরা হয়। এ সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) শেখানো দোয়া— “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর”— বেশি বেশি পাঠ করার তাগিদ দেওয়া হয়।
খুতবার শেষাংশে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, কল্যাণ ও সত্যের ওপর ঐক্য কামনা করে মোনাজাত করা হয়। পাশাপাশি সব হাজির হজ আল্লাহ কবুল করুন এবং তারা যেন গুনাহমুক্ত অবস্থায় নিরাপদে নিজ নিজ দেশে ফিরতে পারেন, সেই দোয়া করা হয়।
এছাড়া মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদের খাদেম সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দীর্ঘায়ু, সফলতা এবং হাজিদের জন্য সুন্দর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য তাদের কল্যাণ ও উত্তম প্রতিদান কামনা করে খুতবা শেষ করা হয়।
খুতবা সমাপ্ত হওয়ার পরপরই পবিত্র আরাফাত ময়দানে জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য আজান দেওয়া হয় এবং পরে নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।