ছবি: সংগৃহীত
সকাল থেকেই আকাশজুড়ে ঘন মেঘ। থেমে থেমে কখনো হালকা, কখনো ভারী বৃষ্টি ঝরছে। এমন বৃষ্টিভেজা আবহাওয়ার মধ্যেই জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। আর সেই হাটে আলাদা করে নজর কাড়ছে ‘কালো মানিক’, ‘রাজা মিয়া’, ‘আইপিএল’ ও ‘বিপিএল’ নামের কয়েকটি বিশাল ষাঁড়। নানা রঙ ও আকৃতির এসব গরুকে ঘিরে শুধু ক্রেতারাই নন, ভিড় করছেন কৌতূহলী দর্শনার্থীরাও।
কোরবানির ঈদের আর মাত্র এক দিন বাকি। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। এমন পরিস্থিতিতে মৌলভীবাজার শহরের কাশীনাথ আলাউদ্দিন হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে বসা পশুর হাটে বেড়েছে মানুষের ভিড়। বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্রেতারা গবাদিপশু নিয়ে আসছেন, আর পছন্দের পশু খুঁজতে হাটে ভিড় করছেন ক্রেতারা।
মৌলভীবাজারে গত কয়েক দিন ধরেই বৃষ্টি হচ্ছে। সোমবার রাত থেকে কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি, কখনো ভারী বর্ষণ হয়েছে। মঙ্গলবার সকালেও বৃষ্টি পুরোপুরি থামেনি। কখনো কুয়াশার মতো হালকা বৃষ্টি, আবার কখনো ঝুম বর্ষণে ভিজছে পুরো এলাকা। এর মধ্যেই জমে উঠেছে কোরবানির পশুর কেনাবেচা।
দুপুরে হাটে গিয়ে দেখা যায়, বিক্রেতারা নিজেদের সুবিধামতো জায়গায় খুঁটির সঙ্গে গরু বেঁধে রেখেছেন। কেউ গরুকে ঘাস খাওয়াচ্ছেন, কেউ ছাগলের সামনে কাঁঠালপাতা দিচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট দলে গরু এনে হাটে তোলা হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে বাড়ছে গবাদিপশুর সংখ্যা, সেই সঙ্গে বাড়ছে ক্রেতাদের ভিড়ও।
হাটের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট-বড় তিনটি কালো রঙের ষাঁড়। কিছুক্ষণ পর একে একে তিনটিই বসে পড়ে। ফ্রিজিয়ান জাতের এই ষাঁড়গুলো সদর উপজেলার উত্তরমুলাইম এলাকা থেকে হাটে আনা হয়েছে। এগুলোর মালিক আবদুল গফফার। তিনি জানান, শখের বসে গাভির বাছুর থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক খাবার খাইয়ে এসব ষাঁড় বড় করেছেন। তার খামারে গাভিসহ প্রায় ৫০টি গরু রয়েছে।
ষাঁড়গুলোর দেখভালের দায়িত্বে থাকা সাজু মিয়া বলেন, “ভুট্টার গুঁড়া, ভুসি আর খড় খাওয়াইছি। কোনো ধরনের কৃত্রিম খাবার দেওয়া হয় নাই।”
তিনটির মধ্যে সবচেয়ে বড় ষাঁড়টির নাম ‘কালো মানিক’। প্রায় সাড়ে তিন বছর বয়সী এই ষাঁড়টির ওজন প্রায় ৩০ মণ। এর দাম চাওয়া হচ্ছে ৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা। সাজু মিয়া জানান, বাড়িতে একজন ক্রেতা এর দাম ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত বলেছেন।
অন্য দুটি ষাঁড়ের নাম রাখা হয়েছে ‘বিপিএল’ ও ‘আইপিএল’। বিপিএলের দাম চাওয়া হচ্ছে ৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং আইপিএলের দাম ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। দুটি ষাঁড়ের ওজনই ২৫ মণের বেশি। সোমবার বিকেলে তিনটি ষাঁড়ই হাটে আনা হয়েছে।
সাজু মিয়া বলেন, “মালিক শখ থাকি পালছইন। খুবই শান্ত এরা। সঠিক দাম পাইলে বেচমু। নাইলে রাখি দিমু।”
এদিকে কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল লালচে রঙের আরেকটি বড় ষাঁড় ‘রাজা মিয়া’। এর দায়িত্বে থাকা সমুজ মিয়া গরুটিকে ঘাস খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলেন। তবে বারবার ঘাস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল রাজা মিয়া।
সমুজ মিয়া জানান, শাহিওয়াল জাতের এই ষাঁড়টি সোমবার বিকেলে হবিগঞ্জের বাহুবল থেকে হাটে আনা হয়েছে। রাজা মিয়ার বয়স তিন বছর এবং ওজন প্রায় ২৬ মণ। নিজেদের খামারের গাভির বাছুর থেকেই এটিকে বড় করা হয়েছে।
হাটের উত্তর পাশে আরও দুটি বড় ষাঁড় দেখা যায়। লাল ও কালো রঙের ষাঁড় দুটি পাশাপাশি দাঁড় করানো ছিল। এগুলোর দায়িত্বে থাকা সৈকত মিয়া জানান, সদর উপজেলার গন্ডেহরি এলাকা থেকে ষাঁড় দুটি আনা হয়েছে। মালিক ছাদিক মিয়া। লাল রঙের ষাঁড়টির ওজন ১২ মণ, দাম চাওয়া হচ্ছে চার লাখ টাকা। কালো রঙেরটির ওজন প্রায় ১০ মণ, দাম চাওয়া হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা।
এ ছাড়া সদর উপজেলার খালিশপুর এলাকা থেকে গলায় ফুলের মালা ও পিঠে রঙিন চাদর জড়িয়ে আরও একটি বিশাল ষাঁড় হাটে আনা হয়েছে। প্রায় এক টন ওজনের এই ষাঁড়টির দাম চাওয়া হচ্ছে আট লাখ টাকা।
হাটজুড়ে বিভিন্ন রঙ ও আকারের গরু-ছাগল উঠছে। যত সময় গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে পশুর সংখ্যা ও ক্রেতাদের ভিড়। ঈদের রাত পর্যন্ত হাট চলবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে টানা বৃষ্টিতে মাঠজুড়ে কাদা জমেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে মাঠে বালি ফেলা হচ্ছে। মাঠের দক্ষিণ পাশে ছাগল নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। পৌরসভার দক্ষিণ পাশের রাস্তাতেও বিক্রির জন্য ছাগল রাখা হয়েছে।
হাটে কেউ গবাদিপশুর জন্য ঘাস বিক্রি করছেন, কেউ ছাগলের জন্য কাঁঠালপাতা নিয়ে বসেছেন। আবার কয়েকজন মাংস কাটার কাঠের গদাও বিক্রি করছেন।
তবে বৃষ্টি যেন পিছু ছাড়ছে না। থেমে থেমে হালকা বৃষ্টি আর দমকা বাতাসে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা—দুই পক্ষেরই দুর্ভোগ বেড়েছে।