কয়েক মাসের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর সেনেগালের প্রধানমন্ত্রী ওসমান সোনকো-কে বরখাস্ত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে। একই সঙ্গে ভেঙে দেওয়া হয়েছে পুরো সরকারও। শুক্রবার আকস্মিকভাবে জারি করা এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
পশ্চিম আফ্রিকার ঋণসংকটে থাকা দেশ সেনেগালে এই সিদ্ধান্ত নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বরখাস্ত হওয়ার আগে পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন ওসমান সোনকো। সম্প্রতি তিনি অভিযোগ করেন, ‘স্বৈরাচারী’ পশ্চিমা দেশগুলো অন্যান্য দেশের ওপর সমকামিতাকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সেনেগালে সমকামিতাসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি আরও কঠোর করতে সম্প্রতি একটি নতুন আইনও পাস হয়েছে। এর পরপরই সোনকোর এমন বক্তব্য এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে বরখাস্ত করার ঘটনায় দেশজুড়ে নতুন আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সোনকো বলেন, আইনটি পাস হওয়ার পর বিদেশ থেকে, বিশেষ করে ফ্রান্সের কাছ থেকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। পশ্চিমাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “তারা যদি এই পথ (সমকামিতা) বেছে নিয়ে থাকে, তবে সেটা তাদের সমস্যা। এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকে আমাদের কোনো শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন নেই, একদমই না।”
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তা ওমর সাম্বা বা অধ্যাদেশটি পড়ে শোনান। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ফায়ে প্রধানমন্ত্রী ওসমান সোনকোকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের দায়িত্বও শেষ হয়েছে। তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
বরখাস্তের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে সোনকো লেখেন, “আলহামদুলিল্লাহ। আজ রাতে আমি কুয়ের গরগুইয়ে শান্তিতে ঘুমাব।” কুয়ের গরগুই ডাকারে অবস্থিত সোনকোর নিজ এলাকা।
বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, মধ্যরাতের পর সোনকো তার বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে শত শত সমর্থক জড়ো হন।
প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে মূলত ওসমান সোনকোর সমর্থনের ওপর ভর করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সোনকোর প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি ছিল। তবে একটি মানহানির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সে সময় সোনকো ফায়েকে সমর্থন জানিয়ে বলেছিলেন, “আমার চেয়েও ফায়ে বেশি নীতিবান। তাঁকে ভোট দেওয়ার অর্থ, আমাকে ভোট দেওয়া।”
একসময় ওসমান সোনকো ছিলেন ফায়ের রাজনৈতিক গুরু। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তা প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নেয়।
সেনেগালে ‘পাস্তেফ পার্টি’ যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সোনকো ও ফায়ে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে দুর্নীতি দমন এবং দুর্বল অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা প্রথম দফার ভোটেই জয় পান। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে সোনকোর জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক। তার প্যান-আফ্রিকান আদর্শ এবং সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সবিরোধী অবস্থান তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
জনপ্রিয়তার দিক থেকে সোনকো এগিয়ে থাকলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাংবিধানিক ক্ষমতা ছিল ফায়ের হাতেই। তিনি অধ্যাদেশ জারি করে প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা রাখেন।
গত কয়েক মাস ধরেই প্রেসিডেন্ট ফায়ে ও প্রধানমন্ত্রী সোনকোর মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসছিল। এতে সরকারে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়। গত মে মাসের শুরুতে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ফায়ে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে সোনকোর একক প্রভাব ও আধিপত্য নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
সেই সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন, তার আস্থা থাকা পর্যন্তই সোনকো প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকবেন। আস্থা হারালে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, সমালোচকদের আক্রমণ থেকে তাকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ফায়ের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন সোনকো।
/এসএন