চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করার অভিযোগে আরও ৪৩টি চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পদক্ষেপের ফলে ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ব্যাটারি, খাদ্যপণ্য, ধাতু ও সৌরশক্তি খাতের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বহু প্রতিষ্ঠান মার্কিন বাজারে নতুন বাধার মুখে পড়বে।যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে উইঘুর ফোর্সড লেবার প্রিভেনশন অ্যাক্ট (UFLPA) এন্টিটি লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।এই তালিকায় থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্য সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়েছে—এমন আইনি ধারণা কার্যকর থাকে। ফলে এসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা যাবে না, যদি না আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করতে পারে যে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করা হয়নি।ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে এই প্রথম নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোকে UFLPA তালিকায় যুক্ত করা হলো। এর মাধ্যমে নিষিদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৪৪ থেকে বেড়ে ১৮৭-এ পৌঁছেছে। ২০২১ সালে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর এটিই একবারে সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘ভিত্তিহীন একতরফা নিষেধাজ্ঞা’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশের বাণিজ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে গঠনমূলক ভার্চুয়াল বৈঠকের মাত্র একদিন পরই যুক্তরাষ্ট্র এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে।চীন আরও বলেছে, নিজেদের কোম্পানিগুলোর বৈধ স্বার্থ রক্ষায় তারা ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেবে। যদিও কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাসও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগকে ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। দূতাবাসের দাবি, চীনের আইন জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধ করেছে এবং জিনজিয়াংয়ের শ্রমিকরা স্বাধীনভাবে নিজেদের পেশা নির্বাচন করতে পারেন।মার্কিন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নতুন তালিকাভুক্ত চারটি প্রতিষ্ঠান জিনজিয়াং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়োগ, স্থানান্তর বা গ্রহণের কাজে যুক্ত ছিল।এছাড়া বাকি ৪১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা জিনজিয়াং অঞ্চল অথবা সেখানকার সরকারি শ্রম কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে।মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের চীনবিষয়ক বিশেষ কমিটির চেয়ারম্যান জন মুলেনার বলেন, ‘আজকের এই পদক্ষেপ দাসশ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।’নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও জ্বালানি সংরক্ষণ ব্যাটারির উপকরণ প্রস্তুতকারী একাধিক কোম্পানি।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এসডিআইসি শিনজিয়াং লিথিয়াম ইন্ডাস্ট্রি, যা লিথিয়াম কার্বোনেট উৎপাদন করে। এর মূল কোম্পানি এসডিআইসি শিনজিয়াং লুওবুপো পটাশকেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানগুলো জিনজিয়াংয়ের লপ নুর লবণ হ্রদ থেকে লিথিয়াম ও পটাশিয়াম সংগ্রহ করে।এছাড়া ব্যাটারির কাঁচামাল প্রস্তুতকারী শিনজিয়াং তিয়ানহংজি টেকনোলজিকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি জিনজিয়াং থেকে পেট্রোলিয়াম কোক, অ্যানথ্রাসাইট কয়লা ও অ্যাসফল্ট সংগ্রহ করে ব্যাটারির উপকরণ তৈরি করে।নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা হুনান আইহুয়া গ্রুপ অ্যালুমিনিয়াম ইলেকট্রোলাইটিক ক্যাপাসিটর উৎপাদন করে, যা ভোক্তা ইলেকট্রনিকস, শিল্প সরঞ্জাম, যানবাহন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়।খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী চাচা ফুডকেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বাদাম ও ভাজা বীজজাতীয় স্ন্যাকস বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশ ও অঞ্চলে রপ্তানি করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, কোম্পানিটি জিনজিয়াং থেকে কৃষিপণ্য সংগ্রহ করে।এছাড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন যন্ত্রপাতি, ট্রান্সফরমার, অ্যালুমিনিয়াম পণ্য এবং সৌর প্যানেলের জন্য পলিসিলিকন উৎপাদনকারী টিবিইএ, তিয়ানশান অ্যালুমিনিয়াম গ্রুপ এবং শানডং গোল্ড মাইনিংসহ একাধিক বড় প্রতিষ্ঠানও নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে।
সূত্র: রয়টার্স
/বিএসএস