ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ও নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন পর্যন্ত ঘোষিত প্রধান লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি। এর ফলে ওয়াশিংটনের মিত্রদের মধ্যেও উদ্বেগ ও আস্থাহীনতা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিও কার্যত তেহরানের কৌশলগত প্রভাবের মধ্যেই রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই প্রত্যাশিত সুবিধা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করছেন অনেকে।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও হামলার মুখে পড়েছে। এসব ঘটনায় মার্কিন সেনাদের হতাহতের খবরও পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনঘন কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের কারণে সামরিক ও কূটনৈতিক—উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মিত্রদের আস্থা কমছে। তাদের মতে, এতে ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো এর কৌশলগত সুবিধা নিতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সাবেক পরিচালক রবিন নিবলেট বলেন, যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে, তবে এখন পর্যন্ত যা অর্জিত হয়েছে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত ক্ষতি এবং মিত্রদের জন্য গভীর অস্বস্তির কারণ। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অনির্ভরযোগ্য পররাষ্ট্রনীতি নিরাপত্তা অংশীদারদের আস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলী ভায়েজও মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার অবস্থায় না থাকলেও তারা বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং ইউরোপ, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অব্যাহত সামরিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তেহরান আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত রাখবে যতক্ষণ না তারা মার্কিন শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই সংঘাত ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা, অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মিত্রদের আস্থার ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি ইউক্রেনসহ অন্যান্য মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট এবং যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনার পালাবদলের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
/এএসএফ