• ঢাকা
  • রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম


বঙ্গ রাজনীতিতে পালাবদল: বিজেপির আধিপত্য আর বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৭ মে ২০২৬ ১২:৫৩ পিএম

পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব যে নীরবে বিস্তার লাভ করছিল, তা নির্বাচনের আগে রাজ্য সফরে গিয়ে স্পষ্টভাবে টের পাওয়া গেছে। বিশেষ করে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু পরিবারের একাংশের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি প্রবল বিরূপ মনোভাব বিস্ময় জাগিয়েছে। অথচ মাত্র দুই বছর আগেও এদের অনেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক ছিলেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে এই পরিবর্তনের পেছনে কী কারণ কাজ করেছে, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

রাজ্যের শহর ও জেলা পর্যায়ে ঘুরে সাধারণ মানুষের মধ্যে মূলত দুর্নীতি, অরাজকতা, স্থানীয় নেতাদের প্রভাব বিস্তার এবং আইনের শাসনের অভাব নিয়ে ক্ষোভের চিত্র সামনে এসেছে। অনেকেই মনে করেছেন, এসবের প্রতিকার পাওয়ার আশা যাঁর কাছ থেকে ছিল, তাঁর নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তায় তারা হতাশ হয়েছেন।

এর পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বও তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে বিভক্তির পরিবেশ তৈরি করেছে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। পিসি-ভাইপো হিসেবে পরিচিত এই দুই নেতার মধ্যে সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে ওঠায় দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ে। অভিষেককে সংস্কারপন্থী হিসেবে দেখা হলেও পুরোনো নেতৃত্বকে সরাতে তিনি আগ্রহী ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে মমতা পুরোনো নেতাদের ধরে রাখতে চেয়েছেন।

২০২১ সালের নির্বাচনে প্রশান্ত কিশোরের আইপ্যাক সংস্থা তৃণমূলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই সংস্থাকে দলের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে নিয়ে আসেন। এর ফলে তৃণমূলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মমতার সরাসরি যোগাযোগ কমে যায় বলে অনেকে মনে করেন। পিসি-ভাইপোর টানাপোড়েনের মধ্যে দলীয় কাঠামোও চাপের মুখে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে বিজেপি শক্ত অবস্থান নিয়ে মাঠে নামে। নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকাও পরিবর্তন প্রত্যাশী মানুষের কাছে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা দেয়। একই সঙ্গে বিজেপির প্রচারণায় হিন্দুত্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দলটির প্রচারে মমতাকে মুসলমানদের ‘ত্রাতা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগাম আভাস আগে কেন স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। কারণ, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন বিপর্যয়ের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল না। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দুর্নীতি ও অরাজকতার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির আসনসংখ্যা ১৮ থেকে কমিয়ে ১২-তে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারের পতনের আগে যে ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত ধাপে ধাপে দৃশ্যমান হয়েছিল, এবারের পরিস্থিতি তেমন ছিল না। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন, ২০০৯ সালের লোকসভা ভোট এবং ২০১০ সালের পৌরসভা নির্বাচন—সব ক্ষেত্রেই তৃণমূলের উত্থান স্পষ্ট ছিল। ফলে ২০১১ সালে বামফ্রন্টের পতন অনেকটাই অনুমিত ছিল।

কিন্তু এবার সেই ধরনের পূর্বাভাস দেখা যায়নি। গত বছর বিধানসভার ১০টি উপনির্বাচনে তৃণমূল সব আসনেই জয় পেয়েছিল। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেছিলেন, মুসলিম ভোটার, নারী ভোটার, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং হিন্দু ভোটারদের একাংশের সমর্থন তাঁকে আবারও জয়ের পথে রাখবে। সাংগঠনিক শক্তির ওপরও তাঁর ভরসা ছিল।

তবে পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া, এসআইআর ঘিরে বিতর্ক, ভোটারদের মধ্যে ভয় কমে যাওয়া এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা পুরো পরিস্থিতিকে বদলে দেয়। মমতা যখন বিষয়টি বুঝতে পারেন, তত দিনে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থান তৃণমূল বনাম রাষ্ট্রের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

এর মোকাবিলায় শেষ চেষ্টা হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনকে ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ ইস্যুতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। বাঙালি জাত্যভিমানকে সামনে আনার চেষ্টা হলেও গত কয়েক বছরের শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতায় সাধারণ মানুষ তাতে সাড়া দেয়নি বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

এই ফলাফলের মাধ্যমে বিহার ও ওডিশার পর পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি শক্তিশালী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করল বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রায় পুরো অঞ্চলই বিজেপির নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। উত্তর প্রদেশ, বিহার, ওডিশা, ত্রিপুরা, মহারাষ্ট্র ও অন্যান্য রাজ্যের আঞ্চলিক নেতাদের দুর্বল করে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে বলেও আলোচনা করা হয়েছে।

অর্ধশতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লিতে একই দলের সরকার প্রতিষ্ঠার বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কেন্দ্রবিরোধিতা একটি বড় বিষয় ছিল। এখন ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের মাধ্যমে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি সামনে আনছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গকে শিল্পোন্নত রাজ্যে পরিণত করার কথাও বলা হয়েছে।

তবে বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, পরিবর্তনের নামে যদি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে জনগণ বিজেপিকেও ছাড় দেবে না।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গও এই নির্বাচনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, এই প্রথম বাংলাদেশকে ঘিরে থাকা প্রায় পুরো অঞ্চলেই বিজেপির প্রভাব বিস্তার ঘটল। বিজেপির ‘ঘুসপেটিয়া’ ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

তবে ইতিবাচক সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তি করতে পারেনি বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। এখন কলকাতা ও দিল্লিতে একই রাজনৈতিক শক্তির সরকার থাকায় সেই অজুহাত আর কার্যকর থাকবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, আসামের আপত্তি উপেক্ষা করে নরেন্দ্র মোদি স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন করেছিলেন। একইভাবে তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাস নতুনভাবে লেখা হতে পারে।

এদিকে বিজেপির এই জয়ে ‘দিদি-মোদি সেটিং’ তত্ত্বও দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মত দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখন কংগ্রেসের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হতে হতে পারে। এত দিন যাঁর নেতৃত্ব মানতে চাননি, সেই রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন জোট রাজনীতিই ভবিষ্যতে তাঁর প্রধান ভরসা হয়ে উঠতে পারে বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

/এইচটি