মার্কিন সেনাবাহিনীতে কর্মরত গ্রেস ওর্তেগার বাবা হুয়ান ওর্তেগাকে গত ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে। মেয়ের মাধ্যমে সামরিক পরিবারের সদস্যদের জন্য দেওয়া বিশেষ থাকার অনুমতির আবেদন চলমান থাকা অবস্থাতেই তাকে বহিষ্কার করা হয়। পরিবারের দাবি, মেক্সিকোতে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করেননি হুয়ান।
গ্রেস ওর্তেগা ২০২৪ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তাঁর সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল সামরিক বাহিনীর একটি কর্মসূচি, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমতি ছাড়া থাকা সেনাসদস্যদের নিকট পরিবারের সদস্যদের জন্য সাময়িকভাবে থাকার অনুমতি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। হুয়ানও মেয়ের মাধ্যমে এই সুবিধার জন্য আবেদন করেছিলেন।
গ্রেস জানান, ভালো একটি চাকরি পাওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করার পাশাপাশি পরিবারের সুরক্ষার আশাতেও তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবা বহিষ্কারের শিকার হওয়ায় তিনি নিজের দেশের কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হুয়ান অভিবাসন কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন যে মেয়ের মাধ্যমে তাঁর থাকার অনুমতির আবেদন চলমান রয়েছে।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, হুয়ানকে মে মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আগে থেকেই বহিষ্কারের চূড়ান্ত আদেশ ছিল বলে মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ জানিয়েছে। সংস্থাটি আরও বলেছে, ২০১৬ সালে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে তাঁর একটি গ্রেপ্তারের ঘটনা ছিল এবং ২০২১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বহিষ্কার আদেশ দেওয়া হয়। তবে সংস্থাটি ওই গ্রেপ্তারের কোনো প্রমাণ দেয়নি এবং তখন তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল কি না, সেটিও জানায়নি।
হুয়ান গ্রেপ্তারের পরও মেয়ের মাধ্যমে করা সামরিক পরিবারের জন্য থাকার অনুমতির আবেদন থেকে আশাবাদী ছিলেন। তিনি তাঁর অভিবাসন মামলা পুনরায় খোলার আবেদনও করেছিলেন এবং মেয়ের সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকার বিষয়টি তার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে তাঁর আবেদনগুলো বহিষ্কারের পরও কার্যকর ছিল কি না, তা স্পষ্ট হয়নি।
গ্রেসের বাবা প্রায় ছয় সপ্তাহ অভিবাসন আটককেন্দ্রে ছিলেন। গ্রেস জানান, সেখানে থাকার সময় তাঁর বাবা প্রায় ১৪ কেজি ওজন হারান এবং হার্নিয়ায় আক্রান্ত হন। হুয়ান আটককেন্দ্রের খাবার, ঘুমানোর ব্যবস্থা, পানির ব্যবস্থা ও গোসলের সুযোগ নিয়েও অভিযোগ করেন।
হুয়ানের আইনজীবী তাঁকে মুক্ত করার জন্য আদালতে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ওই আবেদনের পরপরই ৪ জুলাই তাঁকে মেক্সিকোয় পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। হুয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে মেক্সিকোর চিয়াপাসে নিয়ে যাওয়া হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী পরিবারের কাছ থেকে অনেক দূরের একটি এলাকা।
মেক্সিকোয় পৌঁছানোর পর হুয়ান ও অন্য বহিষ্কৃত ব্যক্তিরা বাসস্টেশনে যাওয়ার জন্য গাড়ি খুঁজছিলেন। তাঁর দাবি, কয়েকজন চালক তাঁদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে এবং অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা পরিবারের কাছ থেকে আরও অর্থ নেওয়ার হুমকি দেয়। হুয়ানের কাছে থাকা ৪০০ মেক্সিকান মুদ্রা দেওয়ার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে তিনি জানান। পরে তিনি মেক্সিকোর সিউদাদ হুয়ারেসে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছান।
হুয়ান এখন মেক্সিকোয় পরিবারের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করছেন। তবে তাঁর স্ত্রী ও চার সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে রয়ে গেছেন। গ্রেস জানান, তাঁর বাবা আগে পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ছিলেন। পরিবারের ছোট ছেলেটির বয়স সাত বছর এবং সে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। তার নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে হুয়ান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিবারের কোনো সদস্য সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক থাকার অনুমতি, বৈধ অভিবাসন মর্যাদা বা অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা থেকে ছাড় পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষও সামরিক পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সাময়িক থাকার অনুমতি বা অন্য কিছু সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রাখে বলে জানিয়েছে।
এদিকে গ্রেসের ঘটনায় সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার ও বহিষ্কার নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সেনাসদস্যদের অন্তত ৫২ জন বাবা-মা ও স্বামী বা স্ত্রীকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার করে আটক করেছে। তাদের মধ্যে অন্তত ছয়জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং একজন নিজে থেকে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছেন।
গ্রেস ওর্তেগার ক্ষেত্রে তাঁর বাবার আবেদন চলমান থাকা সত্ত্বেও তাঁকে মেক্সিকোয় পাঠানো হয়েছে। গ্রেস বলেন, তিনি দেশের জন্য কাজ করতে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন এবং বাবাকে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকবে বলেও আশা করেছিলেন। বাবাকে বহিষ্কারের পর সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে।
/এএসএফ