পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী সাবমেরিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর গোপনীয়তা। সমুদ্রের গভীরে দীর্ঘ সময় অদৃশ্য অবস্থায় থেকে শত্রুপক্ষের ওপর আকস্মিক হামলা চালানোর সক্ষমতা এসব সাবমেরিনকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তবে নিজেদের পারমাণবিক সাবমেরিন বহর নিয়ে বরাবরই কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেছে চীন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের ধারণা, চীনের পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো অন্তত এক দশক ধরে নিয়মিত সমুদ্রে টহল দিচ্ছে। তবে বেইজিং কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেনি। এর মধ্যেই গত ৬ জুলাই প্রশান্ত মহাসাগরে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরল পরীক্ষা চালিয়েছে চীন। বেইজিংয়ের এ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলে বিস্ময় ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা শিনহুয়া জানিয়েছে, একটি ‘ডামি ওয়ারহেড’ বা নকল যুদ্ধাস্ত্র বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্র আন্তর্জাতিক জলসীমার দিকে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং সেটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটি কোথায় পতিত হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি বেইজিং।
এর আগেও চীন সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পরীক্ষা চালিয়েছে। তবে সেসব পরীক্ষা সাধারণত নিজস্ব উপকূলীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করা হতো না। ২০২৪ সালে চীন নিজ ভূখণ্ড থেকে ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়। ১৯৮০ সালের পর সেটিই ছিল দেশটির প্রথম প্রকাশ্য ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা।
বর্তমান পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পেন্টাগনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পরীক্ষার মতো এবারও চীন যুদ্ধকালীন পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতার মহড়া দিয়েছে। এর মাধ্যমে পূর্ণ সক্ষমতায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি যাচাই করা হয়েছে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই চীন দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণ করছে। তাদের মতে, তাইওয়ান ইস্যু যেকোনো সময় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীনের সক্রিয় পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০০। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক পরীক্ষায় সম্ভবত ‘জেএল-২’ অথবা ‘জেএল-৩’ মডেলের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। জেএল-২ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে হলে এটিকে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যবর্তী এলাকা থেকে উৎক্ষেপণ করতে হবে।
অন্যদিকে জেএল-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার। ফলে এটি চীনের নিজস্ব উপকূলীয় জলসীমা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। গত বছর বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এক সামরিক কুচকাওয়াজে এই দুটি ক্ষেপণাস্ত্রই প্রদর্শন করা হয়েছিল।
চীনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক ওয়াং কিয়াং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতে এক পূর্বাভাসে বলেছেন, চলতি বছর অথবা আগামী বছরের শেষ নাগাদ চীন আকাশ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও চালাতে পারে।
তার মতে, এ পরীক্ষা সফল হলে চীন ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’ বা পারমাণবিক ত্রয়ী শক্তির কার্যকর সক্ষমতা অর্জনের পথে বড় অগ্রগতি দেখাবে। অর্থাৎ তখন দেশটি ভূমি, আকাশ ও সমুদ্র—এই তিনটি মাধ্যম থেকেই পারমাণবিক হামলা চালানোর সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার আগে চীন অঞ্চলের কয়েকটি দেশকে আগাম অবহিত করেছিল। তারপরও অনেক দেশ এ পদক্ষেপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শুরু হওয়ার ঠিক আগে এবং অস্ট্রেলিয়া-ফিজির মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চীন এই পরীক্ষা চালায়। দীর্ঘদিন ধরেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব মোকাবিলার চেষ্টা করছে অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে ‘অস্থিতিশীল’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেছেন, চীন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করুক, তা তারা কোনোভাবেই চান না।
বর্তমানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাকি চার স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়ার পাশাপাশি ভারত এবং উত্তর কোরিয়াও এ ধরনের পারমাণবিক সাবমেরিন পরিচালনা ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বেইজিংয়ের এই শক্তি প্রদর্শন এশিয়ায় তাদের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও সংশয় সৃষ্টি করেছে।
/এসএন