• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম


একসময় ছেলেদেরই পছন্দের রং ছিল গোলাপি! গোলাপি কীভাবে হয়ে উঠল মেয়েদের রং, জানলে অবাক হবেন

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২২ আগস্ট ২০২৬ ৬:৪৬ পিএম

গোলাপি বা পিংক দেখলেই বর্তমানে অনেকের মনে মেয়েদের পোশাক, পুতুল কিংবা রাজকন্যার গল্পের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, গোলাপিকে মেয়েদের রং হিসেবে দেখার এই ধারণা খুব পুরোনো নয়। বরং প্রায় এক শতাব্দী আগেও অনেক ক্ষেত্রে গোলাপিকেই ছেলেদের জন্য বেশি উপযোগী রং হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

শিশুদের পোশাকে একসময় ছিল না রঙের লিঙ্গভেদ

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে শিশুদের সাদা পোশাক পরানোর প্রচলন ছিল। ফ্যাশন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মিউজিয়াম পরিচালক ভ্যালেরি স্টিলের মতে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে ও মেয়েরা একই ধরনের গোলাপি, নীলসহ বিভিন্ন রঙের পোশাক পরত।

সাদা পোশাক জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে ছিল ব্যবহারিক কারণ। শিশুদের ডায়াপার পরিবর্তনের সুবিধা এবং পোশাক নোংরা হলে সহজে ব্লিচ করে পরিষ্কার করা যেত বলে সাদা রং ব্যবহার করা হতো।

মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পোশাক-ইতিহাসবিদ এবং ‘Pink and Blue: Telling the Girls From the Boys in America’ বইয়ের লেখক জো বি. পাওলেত্তির গবেষণায় দেখা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে শিশুদের পোশাকে প্যাস্টেল রঙের ব্যবহার বাড়তে শুরু করলেও তখনও কোনো নির্দিষ্ট রংকে নির্দিষ্ট লিঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাংকলিন ডেলানো রুজভেল্টের দুই বছর বয়সের একটি বিখ্যাত ছবিতেও দেখা যায়, তিনি সাদা স্কার্ট ও কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুলে ছিলেন। ১৮৮৪ সালে ছোট ছেলেদের এমন পোশাকে থাকা ছিল একেবারেই স্বাভাবিক বিষয়।

ভিক্টোরীয় যুগে প্রচলিত সামাজিক রীতি অনুযায়ী ছেলেরা ৬-৭ বছর বয়স পর্যন্ত পোশাক পরত। এরপর প্যান্ট পরার মধ্য দিয়ে তাদের বড় হয়ে ওঠার একটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হতো।

গোলাপি কীভাবে ছেলেদের রং হিসেবে বিবেচিত হলো

১৯ শতকের শেষ ভাগ এবং ২০ শতকের শুরুর দিকে শিশুদের পোশাক ও সামগ্রী বিক্রি বাড়াতে কিছু প্রতিষ্ঠান রঙের মাধ্যমে ছেলে-মেয়েদের আলাদা করার কৌশল নিতে শুরু করে। তবে সেই সময় প্রচলিত ধারণাটি ছিল বর্তমানের সম্পূর্ণ বিপরীত।

১৯১৮ সালের জুনে প্রকাশিত শিশুদের পোশাকবিষয়ক বাণিজ্যিক সাময়িকী ‘আর্নশস ইনফ্যান্টস ডিপার্টমেন্ট’-এ বলা হয়েছিল, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ছেলেদের জন্য গোলাপি এবং মেয়েদের জন্য নীল বেশি উপযুক্ত। কারণ গোলাপিকে তুলনামূলকভাবে দৃঢ় ও জোরালো রং হিসেবে দেখা হতো। বিপরীতে নীলকে কোমল ও সূক্ষ্ম রং মনে করা হতো বলে মেয়েদের জন্য সেটিকে বেশি মানানসই ধরা হয়েছিল।

কালার এক্সপার্ট ও প্যানটোন কালার ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক লিয়াট্রিস আইজম্যানের ব্যাখ্যায়, গোলাপি যেহেতু লালের হালকা রূপ এবং লালকে ঐতিহ্যগতভাবে তীব্র, আবেগপ্রবণ ও আক্রমণাত্মক রং হিসেবে দেখা হতো, তাই গোলাপিকেও ছেলেদের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করা হয়েছিল।

অন্যদিকে নীলকে আকাশ ও দিনের আলোর সঙ্গে সম্পর্কিত করে কোমল ও নমনীয় রং হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাই এটি মেয়েদের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা হয়। কারও কারও মতে, নীলের সঙ্গে কুমারী মেরির ঐতিহ্যগত সম্পর্কও এই ধারণার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

এই রঙের ধারণার শিকড় আরও পুরোনো। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চিত্রশিল্পী দুচ্চিও শিশু যিশুকে গোলাপি পোশাকে এঁকেছিলেন।

কখন বদলে গেল গোলাপি ও নীলের সমীকরণ

১৯২০-এর দশক থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও দোকান ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করতে শুরু করে। তবে তখনও এ বিষয়ে কোনো সর্বজনীন নিয়ম ছিল না। কোনো প্রতিষ্ঠান ছেলেদের জন্য গোলাপি সুপারিশ করত, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান মেয়েদের জন্য গোলাপি বা নীলকে বেছে নিত।

১৯২৭ সালে টাইম ম্যাগাজিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান দোকানের তথ্যের ভিত্তিতে একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, তখনও অধিকাংশ দোকান মেয়েদের জন্য নীল এবং ছেলেদের জন্য গোলাপি ব্যবহারের সুপারিশ করছিল।

পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৪০-এর দশকে। ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, ওই দশকের বেবি বুমার প্রজন্মই প্রথম বর্তমান পরিচিত লিঙ্গভিত্তিক পোশাকের ধারণায় বড় হয়। ছেলে ও মেয়েদের ছোট আকারের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারীর আদলে সাজানো শুরু হয়। এ সময় গোলাপি মেয়েদের এবং নীল ছেলেদের রং হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে।

তবে ঠিক কী কারণে নির্মাতারা এই সময়ে গোলাপিকে মেয়েলি রং হিসেবে চূড়ান্তভাবে বেছে নিয়েছিলেন, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ইতিহাসবিদদের কাছেও স্পষ্ট নয়।

নারী স্বাধীনতা আন্দোলনে আবার বদল

সত্তরের দশকে নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাবে গোলাপি-নীলের এই বিভাজন আবার কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই মনে করতেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের নির্দিষ্ট ধরনের ‘মেয়েলি’ পোশাক ও রঙের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলা তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সীমিত করতে পারে।

ফলে ওই সময়ে অনেক অভিভাবক লিঙ্গনিরপেক্ষ রং ও পোশাক বেছে নিতে শুরু করেন। গোলাপি এড়িয়ে চলার প্রবণতাও দেখা যায়।

তবে আশির দশকে এসে গোলাপি ও নীলের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন আবার শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে এবং এবার তা আরও স্থায়ী রূপ পায়। এর অন্যতম কারণ ছিল প্রি-নেটাল টেস্টিং বা গর্ভাবস্থায় সন্তানের লিঙ্গ আগেভাগে জানার প্রযুক্তির বিস্তার।

সন্তান জন্মের আগেই তার লিঙ্গ জানা সম্ভব হওয়ায় বাবা-মায়েরা নার্সারি সাজানো, পোশাক কেনা এবং অন্যান্য সামগ্রী কেনার সময় নির্দিষ্ট রং বেছে নিতে শুরু করেন। প্রস্তুতকারকেরাও এই প্রবণতাকে কাজে লাগায়। ছেলে বা মেয়ে অনুযায়ী আলাদা পোশাক ও সামগ্রী কেনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাজারে রঙের এই বিভাজন আরও শক্তিশালী হয়।

ধীরে ধীরে গোলাপি মেয়েশিশু এবং নীল ছেলেশিশুর প্রতীক হিসেবে বাজার ও সংস্কৃতিতে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করে নেয়।

গোলাপি রং, বিপণন ও ‘পিংক ট্যাক্স’

গোলাপি যখন মেয়েদের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তখন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই প্রবণতাকে বিপণন কৌশলে কাজে লাগাতে শুরু করে। সাইকেল, স্কুটার, খেলনা, রেজর থেকে শুরু করে কলম পর্যন্ত একই ধরনের পণ্যের গোলাপি সংস্করণ আলাদাভাবে ‘মেয়েদের জন্য’ বাজারজাত করা শুরু হয়।

এভাবেই ‘পিংক ট্যাক্স’ শব্দবন্ধটি আলোচনায় আসে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক কর নয়। বরং এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে নারীদের জন্য বাজারজাত করা রেজর, ডিওডোরেন্ট বা প্রসাধনী সামগ্রীর মতো পণ্য প্রায় একই উপাদান ও মানের পুরুষদের পণ্যের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হয়।

নিউইয়র্ক সিটি ভোক্তা বিষয়ক বিভাগের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নারীদের জন্য বাজারজাত পণ্য গড়ে পুরুষদের পণ্যের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৪ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, একই ধরনের পণ্য ও সেবার জন্য নারীদের বছরে পুরুষদের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৩৫১ ডলার বেশি ব্যয় করতে হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে স্যানিটারি পণ্যকে বিলাসদ্রব্য হিসেবে বিবেচনা করে সাধারণ কর আরোপ করা হয়, যা আলাদাভাবে ‘ট্যাম্পন ট্যাক্স’ নামে পরিচিত।

তবে এই মূল্যবৈষম্যের ব্যাপ্তি নিয়ে সব গবেষণার ফল এক নয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের ডিওডোরেন্ট পুরুষদের পণ্যের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হলেও নারীদের ডিসপোজেবল রেজর তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়া যায়।

গোলাপি কি সত্যিই মেয়েদের সহজাত পছন্দ?

সামাজিক বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গোলাপি ও নীলের এই লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন মানুষের কোনো সহজাত জৈবিক প্রবণতার ফল নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবার এবং বাজারের প্রভাবে তৈরি হয়েছে এই ধারণা।

ইতিহাস যদি অন্যভাবে এগোত, তাহলে আজ হয়তো গোলাপি নয়, নীলই মেয়েদের ‘চিরায়ত’ পছন্দের রং হিসেবে পরিচিত হতো। আর গোলাপি হয়তো এখনো ছেলেদের রং হিসেবেই পরিচিত থাকত।

তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে সিএনএন, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, ব্রিটানিকা, দ্য ভিনটেজ নিউজ, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের জো বি. পাওলেত্তির গবেষণা, জেজেবেল, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া মেডিকেল জার্নাল এবং ‘পিংক ট্যাক্স’ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য চেজ, নাউ ও ইউএস নিউজ।

/এসএন