• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম


ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে বাড়বে শীত, দেশে ৪ থেকে ৬টি শৈত্যপ্রবাহের আশ’ঙ্কা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৬ নভেম্বর ২০২৬ ৩:৫৮ পিএম


দিনের বেলায় সূর্যের তাপ এখনো তেমন কমেনি। তবে মাঝরাতে পাখার গতি কমিয়ে দেওয়া কিংবা শেষরাতে গায়ে কাঁথা জড়িয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা জানান দিচ্ছে, শীতের আগমন আর বেশি দূরে নয়। কংক্রিটের শহরে শীতের উপস্থিতি এখনো তেমন স্পষ্ট না হলেও দেশের উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে বইতে শুরু করেছে ঠান্ডা বাতাস। বিস্তীর্ণ মাঠ ও নদীর তীর ভোরের কুয়াশায় ঢাকতে শুরু করেছে।

প্রকৃতির এমন পরিবর্তনের মধ্যে শীত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী তিন মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে ৪ থেকে ৬টি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে ২ থেকে ৩টি শৈত্যপ্রবাহ তীব্র আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে।

চলতি নভেম্বর থেকে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের জন্য প্রকাশিত দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শীত মৌসুমে কয়েক দফায় শৈত্যপ্রবাহের পাশাপাশি কুয়াশা, লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান মো. মমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই তিন মাসে দেশে ৪ থেকে ৬টি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে ২ থেকে ৩টি শৈত্যপ্রবাহ তীব্র রূপ নিতে পারে।

অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে সেটিকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এলে তা মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে সেটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।

শৈত্যপ্রবাহের সময় ও সম্ভাব্য অঞ্চল সম্পর্কে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর মাসে এক থেকে দুটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে। বিশেষ করে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে—রাজশাহী, রংপুর এবং খুলনা বিভাগের কিছু এলাকায়—তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসতে পারে। এসব অঞ্চলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে জানুয়ারি মাসে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা বেশি। এ সময় কখনো কখনো এক বা দুটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। তখন তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে আসতে পারে বলে জানান তিনি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, আগামী তিন মাসে শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং নদ-নদীর অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। দেশের অন্যান্য এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঘন কুয়াশার কারণে দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে আসতে পারে। এর ফলে শীতের অনুভূতি আরও বাড়তে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে এই সময়ে দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

এর ব্যাখ্যায় ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এল নিনো সক্রিয় থাকা এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও এর প্রভাব থাকবে। এ কারণে এ অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকতে পারে। তাই এবার শীত মৌসুমে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু সময়ে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, শৈত্যপ্রবাহ থাকলেও অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহের দিনসংখ্যা, সংখ্যা ও স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। এ কারণেই এবারের শীতকাল কিছুটা ‘উষ্ণ’ থাকার কথা বলা হচ্ছে।

ড. আবুল কালাম মল্লিক আরও বলেন, এল নিনো সক্রিয় থাকায় শৈত্যপ্রবাহ কত দিন স্থায়ী হবে এবং কতবার বয়ে যাবে, সে বিষয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তবে সার্বিকভাবে এবারের শীত মৌসুম কিছুটা ‘উষ্ণ’ হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

শীতের পূর্বাভাসের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন মাসে বঙ্গোপসাগরে ২ থেকে ৪টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে এক থেকে দুটি লঘুচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বাংলাদেশে অক্টোবর ও নভেম্বর মাস সাধারণত ঘূর্ণিঝড়প্রবণ। প্রতিবছর এ সময় বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ তৈরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব লঘুচাপ শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়।

তিনি বলেন, এ সময় সূর্যের দক্ষিণায়ন চলতে থাকে। ফলে দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে কমে এবং রাতের দৈর্ঘ্য বাড়ে। বঙ্গোপসাগর এলাকায় সূর্যের আলোর প্রাপ্যতা বেশি থাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পায়।

এটিকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এমন ঘটনা প্রতিবছর ঘটে না; মাঝেমধ্যে দেখা যায়। এ ধরনের ব্যবস্থাকে ‘ট্রানজিয়েন্ট’ বা ক্ষণস্থায়ী সিস্টেম বলা হয়।

বৃষ্টিপাতের বিষয়ে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী তিন মাসে দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে নভেম্বরে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে, ৩৫ থেকে ৪০ মিলিমিটার। বরিশাল বিভাগে ৩০ থেকে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। ঢাকা, সিলেট ও খুলনা বিভাগে বৃষ্টির পরিমাণ থাকতে পারে ১৫ থেকে ২৫ মিলিমিটার। অন্যদিকে ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং রংপুর বিভাগে ৪ থেকে ৮ মিলিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও কমে আসতে পারে। ডিসেম্বরে ঢাকা বিভাগে ৮ থেকে ১০ মিলিমিটার এবং সিলেট বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জানুয়ারিতে খুলনা বিভাগে ১০ থেকে ১৪ মিলিমিটার এবং ঢাকা-সহ অন্যান্য বিভাগে ৬ থেকে ১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিভিন্ন আবহাওয়াগত উপাত্ত, ঊর্ধ্বাকাশের আবহাওয়ার বিন্যাস, জলবায়ু মডেল এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অনুমোদিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের মডেল পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে এই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এল নিনো ও লা নিনা পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ১৯৪৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে বঙ্গোপসাগরে কতটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে, তার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, এ সময় গড়ে এক থেকে তিনটি লঘুচাপ তৈরি হয়। এর মধ্যে কোনো কোনোটি কখনো কখনো শক্তি সঞ্চয় করে। দীর্ঘ সময়ের এমন গড় পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

তবে এ ধরনের পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে বলে সতর্ক করেন এই আবহাওয়াবিদ। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের পাশাপাশি প্রতিদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে গত অক্টোবর মাসে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ৬৮ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। ওই মাসে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় সিলেটে, ৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ১৭ অক্টোবর এ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। অন্যদিকে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়, ১৫ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা রেকর্ড করা হয় ২৭ অক্টোবর।

গত মাসে দেশের সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় যথাক্রমে ১ দশমিক ৮, ০ দশমিক ৪ ও ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

/এসএন