রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে থাকলেও ঘুম আসছে না। ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে যাচ্ছে রাত ২টা, ৩টা। কারও কারও কানে ভেসে আসে ফজরের আজান, তবু চোখে ঘুম নেই। কমবেশি অনেকেই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। সারাদিন পরিশ্রম করার পরও রাতে ঠিকমতো ঘুম না আসার কারণ নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের ছোট ছোট কিছু অভ্যাস ও জীবনযাপনের ভুলের কারণে রাতের গভীর ঘুম ব্যাহত হতে পারে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো ‘স্লিপ হাইজিন’ বা ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি ঠিকভাবে মেনে না চলা।
ঘুমের গুণগত মান বাড়াতে দৈনন্দিন জীবনে কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নিয়মিত ঘুমের সময় মেনে চলা থেকে শুরু করে ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন ব্যবহার কমানো—এ ধরনের অভ্যাস রাতের ঘুমের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
স্লিপ হাইজিন বা ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি কী?
স্লিপ হাইজিন বলতে এমন কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে বোঝায়, যা শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। কখন ঘুমাতে হবে এবং কখন ঘুম থেকে জাগতে হবে, শরীরের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তার ওপর প্রভাব ফেলে।
মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভালো ঘুমের জন্য শুধু রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগের অভ্যাসই দায়ী নয়; সারাদিনের কার্যক্রমও এর ওপর প্রভাব ফেলে। দিনের খাবার, শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ সামলানোর ধরন এবং ঘুমানোর আগে কী করা হচ্ছে—সবকিছুই ঘুমের মানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি উন্নত করার ১২টি উপায় তুলে ধরা হলো।
১. ঘুম ও জেগে ওঠার নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন
প্রতিদিন রাতে কখন ঘুমাতে যাবেন এবং সকালে কখন ঘুম থেকে উঠবেন, তা নির্দিষ্ট করে নিন। ছুটির দিনেও এই সময়সূচি যথাসম্ভব মেনে চলুন। নিয়মিত একই সময়ে ঘুমানো ও জেগে ওঠার অভ্যাস তৈরি হলে শরীর ধীরে ধীরে সেই রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়।
ফলে ঘুমানোর নির্ধারিত সময় এলে স্বাভাবিকভাবেই ঘুম পেতে পারে। একই সঙ্গে সকালে ঘুম থেকে ওঠাও সহজ হয়। দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুমানোর প্রবণতা কমাতেও এ অভ্যাস সহায়ক হতে পারে।
বয়স অনুযায়ী প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ থাকে, এমন একটি সময়সূচি বেছে নেওয়া ভালো। প্রতিদিনের ব্যস্ততা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
২. ঘুমানোর আগে স্বস্তিদায়ক রুটিন তৈরি করুন
ঘুমাতে যাওয়ার আগে মানসিক চাপ বাড়ায় এমন কাজ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে থেকেই শরীর ও মনকে শান্ত করার প্রস্তুতি নিতে পারেন। এমন কাজ বেছে নিন, যা আপনাকে মানসিক প্রশান্তি দেয়। তবে এ সময় ফোন বা অন্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার না করাই ভালো।
হালকা গরম পানিতে গোসল করতে পারেন। গোসলের পর শরীর ও মনে প্রশান্তি আসতে পারে। এ ছাড়া গোসলের পর শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা কমে যাওয়ায় ঝিমুনি অনুভূত হতে পারে।
পেশির টান ও ক্লান্তি কমাতে হালকা স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম করা যেতে পারে। কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করে মেডিটেশন করলে মন শান্ত করতে এবং দুশ্চিন্তা কমাতে সহায়তা মিলতে পারে।
এ ছাড়া পছন্দের হালকা গান শোনা কিংবা বই পড়াও ঘুমের আগে স্বস্তিদায়ক অভ্যাস হতে পারে। বই পড়ার ক্ষেত্রে মুদ্রিত বই বেছে নেওয়া ভালো; ফোনে পিডিএফ পড়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
৩. ঘুমানোর আগে মোবাইল ও গ্যাজেট থেকে দূরে থাকুন
স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও ট্যাবের পর্দা থেকে নির্গত উজ্জ্বল নীল আলো শরীরে ‘মেলাটোনিন’ হরমোনের উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। এই হরমোন শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া ঘুমানোর সময় বিছানার পাশে ফোন থাকলে নোটিফিকেশনের শব্দ বা কম্পনে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। এতে সারা রাতের ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
তাই ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে সরিয়ে রাখার অভ্যাস করুন। সম্ভব হলে শোবার ঘরে ইলেকট্রনিক ডিভাইস না রাখাই ভালো।
৪. নিয়মিত হাঁটুন, তবে ঘুমের আগে ভারী ব্যায়াম নয়
প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট হাঁটার অভ্যাসও ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে সকালে নরম রোদে কিছুক্ষণ হাঁটলে শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের চক্র ঠিক রাখতে সুবিধা হতে পারে।
তবে ঘুমানোর আগের তিন ঘণ্টার মধ্যে ভারী ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকা উচিত। অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম শরীরকে সজাগ করে তুলতে পারে, ফলে সহজে ঘুম আসতে চায় না। রাতে শরীরচর্চা করতে চাইলে হালকা স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম বেছে নিতে পারেন।
৫. ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত করুন
সন্ধ্যার দিকে চা বা কফি পান করার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু ক্যাফেইন সাময়িকভাবে সতেজ অনুভব করালেও এর প্রভাব শরীরে প্রায় আট ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
ফলে দিনের বেলায় পান করা কফিও রাতে ঘুমাতে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই চা বা কফি পান করার অভ্যাস থাকলে তা সকালের দিকে সীমিত রাখার চেষ্টা করুন। তবে ক্যাফেইনের প্রভাব ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
৬. শোবার ঘরের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন
গভীর ঘুমের জন্য শোবার ঘরের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের জন্য ঘরের তাপমাত্রা প্রায় ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে আরামদায়ক হতে পারে। নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী আরামদায়ক তোশক, বালিশ ও চাদর ব্যবহার করুন। অতিরিক্ত পুরোনো বা দেবে যাওয়া তোশক এড়িয়ে চলুন।
হালকা শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে কানের প্লাগ কিংবা হোয়াইট নয়েজ মেশিন ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরে বাইরের আলো প্রবেশ বন্ধ করতে ডার্ক কার্টেন বা চোখ ঢাকার মাস্কও কাজে লাগতে পারে।
৭. বিছানা শুধু ঘুমানোর জন্য ব্যবহার করুন
বিছানায় আরাম লাগে বলে অনেকে দিনের বেশির ভাগ সময় সেখানেই কাটান। বিছানায় শুয়ে ল্যাপটপে অফিসের কাজ করা, ফোনে কথা বলা, খাওয়া-দাওয়া, সিনেমা দেখা কিংবা বই পড়ার অভ্যাসও অনেকের রয়েছে।
তবে এ ধরনের অভ্যাস মস্তিষ্কের কাছে বিছানার ব্যবহার সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর সংকেত দিতে পারে। বিছানাকে মূলত ঘুমের জায়গা হিসেবে ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো। বিছানায় বসে ল্যাপটপে কাজ করলে মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে উঠতে পারে, যা ঘুম আসতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
৮. ঘুম না এলে বিছানায় ছটফট করে পড়ে থাকবেন না
চোখে ঘুম নেই, অথচ বিছানায় শুয়ে বারবার এপাশ-ওপাশ করছেন—এমন পরিস্থিতিতে অযথা বিছানায় পড়ে থেকে বিরক্তি বাড়ানোর প্রয়োজন নেই।
বরং বিছানা থেকে উঠে ঘরের বাইরে বা অন্য কোনো আরামদায়ক স্থানে গিয়ে শান্তভাবে এমন কিছু করুন, যা আপনাকে স্বস্তি দেয়। যেমন, সোফায় বসে বই পড়তে পারেন কিংবা হালকা কোনো ব্যায়াম করতে পারেন। যখন আবার ঘুম ঘুম ভাব আসবে, তখন বিছানায় ফিরে যান।
ঘুম না আসা অবস্থায় দীর্ঘ সময় বিছানায় ছটফট করলে মানসিক চাপ ও বিরক্তি আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই ঘুমের জন্য নিজেকে জোর না করে শরীর ও মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন।
৯. দিনের বেলা ঘুমানোর অভ্যাস কমান
দুপুরের খাবারের পর ঘুমানোর অভ্যাস অনেকের রয়েছে। কিন্তু দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমালে রাতে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।
একান্তই বিশ্রামের প্রয়োজন হলে দুপুরে অল্প সময়ের জন্য ঘুমাতে পারেন। তবে সেই ঘুম যেন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বেশি না হয়। বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার পর ঘুমানো এড়িয়ে চলা ভালো। এতে রাতের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সুবিধা হতে পারে।
১০. ঘুমানোর আগে দুশ্চিন্তা কমানোর চেষ্টা করুন
মাথায় নানা দুশ্চিন্তা, পরদিনের কাজের চাপ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা নিয়ে বিছানায় গেলে মন সহজে শান্ত হতে চায় না। ফলে ঘুমানোর চেষ্টা করলেও ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।
এ সমস্যা এড়াতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটি ডায়েরিতে নিজের দুশ্চিন্তা ও পরদিনের জরুরি কাজগুলো লিখে রাখতে পারেন। কাগজে কলমে বিষয়গুলো লিখে রাখলে সেগুলো মনে ধরে রাখার চাপ কিছুটা কমতে পারে।
এ ছাড়া কয়েক মিনিট মেডিটেশন করার মাধ্যমেও মন শান্ত করার চেষ্টা করা যেতে পারে।
১১. রাতে ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন
ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত বা ভারী খাবার খেলে হজমের সমস্যা হতে পারে। এর পাশাপাশি বুক জ্বালাপোড়া ও অ্যাসিডিটির মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে, যা রাতের ঘুম ব্যাহত করতে পারে।
তাই রাতে হালকা ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। পাশাপাশি ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল ও নিকোটিন এড়িয়ে চলুন। এগুলো ঘুমের গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
১২. পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলোতে সময় কাটান
দিনের বেলায় অন্তত ৩০ মিনিট সূর্যের আলোতে সময় কাটানো শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি ঠিক রাখতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সূর্যের আলোতে কিছুক্ষণ থাকলে রাতে ভালো ঘুম হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
তাই কাজের ফাঁকে দিনের বেলায় বাইরে গিয়ে কিছুটা সময় আলো-বাতাসে কাটানোর অভ্যাস করুন। নিয়মিত এ অভ্যাস শরীরের ঘুম ও জেগে থাকার স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
ভালো ঘুম সুস্থ ও সুন্দর জীবনের অন্যতম ভিত্তি। দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন এনে রাতের ঘুমের মান উন্নত করা সম্ভব হতে পারে। তবে এসব নিয়ম মেনে চলার পরও দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ, দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যার পেছনে অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক কারণও থাকতে পারে।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম হেলথলাইনে ‘12 Healthy Sleep Hygiene Tips’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম শুচি।
/এসএন