• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪৬ এএম


৪০ রাত বোমার শব্দে আতঙ্কে জেগে উঠেছে আমার সন্তানেরা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২০ মে ২০২৬ ১০:২১ পিএম

ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা মুর্তজা অতাশ জমজম জানিয়েছেন, দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর আবার বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ পেয়ে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। কারণ, এই সময়ের মধ্যে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে তাঁর কাছে অসংখ্য বার্তা এসেছে। যুদ্ধের দিনগুলোতে বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁর, তাঁর পরিবারের এবং ইরানের মানুষের খোঁজখবর নিয়েছেন।

তিনি বলেন, এসব বার্তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে বাংলাদেশ থেকে। শুধু পরিচিত শিল্পী ও বন্ধুদের কাছ থেকেই নয়, এমন অনেক মানুষের কাছ থেকেও তিনি বার্তা পেয়েছেন, যাঁদের সঙ্গে তাঁর কখনো পরিচয় হয়নি। তাঁর ভাষায়, এই হৃদয়ছোঁয়া অনুভূতির অর্থ একটাই—বাংলাদেশ ও ইরানের মানুষের মধ্যে মানবতা ও সংস্কৃতির গভীর এক অভিন্ন শিকড় রয়েছে।

মুর্তজা অতাশ জমজম আরও বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে তিনি উপলব্ধি করেছেন, ইরানের মানুষের প্রতি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা কতটা গভীর। তাঁর মতে, এই ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি কেবল একটি শব্দ নয়; এটি মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত এক আন্তরিক সম্পর্ক।

বাংলাদেশে অবস্থানের সময় অনেক নারী ও পুরুষ তাঁকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে হয়তো এটি সাধারণ সম্বোধন মনে হয়েছিল, কিন্তু এখন তিনি বুঝতে পেরেছেন, এটি বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে লালিত এক সত্যিকারের অনুভূতি। তাঁর কাছে এটি এক মহৎ মানবিক গুণ, যা গর্ব করার মতো।

তিনি বলেন, আগের চেয়েও বেশি আন্তরিকতার সঙ্গে এখন তিনি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে এই ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কে গর্ব অনুভব করেন।

মুর্তজা অতাশ জমজম বলেন, ইরান হলো মাওলানা, সাদি, হাফিজ, খৈয়াম, নিজামি ও রুদাকির দেশ। এমন একটি জাতি, যারা প্রেম, সৌন্দর্য ও মানবিকতাকে শ্রদ্ধা করে এবং যুদ্ধকে মানবতার শত্রু ও অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখে।

তাঁর ভাষায়, যুদ্ধ কখনো ধ্বংস আর হত্যাযজ্ঞ ছাড়া কিছু নয়। ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে অসহায় শিকার হয়ে এসেছে নারী ও শিশুরা। সাম্প্রতিক ইসরায়েল ও আমেরিকার আগ্রাসনেও সেই নির্মম সত্য আবার সামনে এসেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

নিজের পরিবারের পরিস্থিতি তুলে ধরে মুর্তজা অতাশ জমজম বলেন, তাঁদের বাসা থেকে দুই রাস্তা দূরের একটি হাসপাতালে বোমা হামলার ঘটনায় তাঁদের অ্যাপার্টমেন্টের জানালাগুলো ভেঙে যায়। এরপর কয়েক সপ্তাহ পরিবার নিয়ে তাঁকে নিজের অফিসে থাকতে হয়েছে।

সন্তানদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা শারীরিকভাবে ভালো থাকলেও টানা ৪০ রাত বোমা হামলার ভয়াবহ শব্দে ঘুম ভেঙে আতঙ্কে কেঁপে উঠত। তিনি সন্তানদের বুকে জড়িয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতেন। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করেন, তাঁর দেশের অনেক শিশু তাদের মা-বাবার কোলেই প্রাণ হারিয়েছে।

মুর্তজা অতাশ জমজম দাবি করেন, বর্তমান যুদ্ধে ৩ হাজার ৩৭৫ জন শহীদের অধিকাংশই ছিলেন নিরীহ নারী, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ। হামলার প্রথম দিকে মিনাবের শাজারা তাইয়েবা স্কুলে ১৬৭ শিশু নিহত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, নিষ্পাপ সেই ফেরেশতারা মুহূর্তেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।

তিনি বলেন, ইরানের মানুষ কখনো যুদ্ধ চায় না। তবে নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার জন্য তারা সর্বশক্তি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হাজারো বিমান হামলায় অসংখ্য স্কুল, হাসপাতাল ও ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি ইরানের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেগুলোর ইতিহাস আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কারেরও বহু আগের। ইউনেসকোর ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন এবং শত শত বছরের পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রেহাই পায়নি বলে জানান তিনি।

তাঁর কথায়, “হয়তো তারা ঝড় তুলতে পেরেছে; কিন্তু সত্য হলো—আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিবৃক্ষের ডালপালা ঝড়ে নুইয়ে পড়তে পারে; কিন্তু তার শিকড় কখনো উপড়ে যায় না।”

এরপর তিনি ইরানি সংস্কৃতির কিংবদন্তির পাখি ‘সিমুর্গ’-এর উপাখ্যান তুলে ধরেন। মহান কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের বিখ্যাত ‘মানতিকুত তোয়ায়ের’-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সত্যের সন্ধানে ৩০টি ক্লান্ত ও অনুসন্ধানী পাখি কাফ পর্বতের দিকে উড়ে গিয়েছিল সিমুর্গকে খুঁজে পাওয়ার আশায়। যাত্রাপথে ঐক্য, আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার শক্তি তাদের এক করে দেয়। শেষ পর্যন্ত তারা উপলব্ধি করে, সিমুর্গ আসলে তাদের সম্মিলিত অস্তিত্বেরই প্রতিচ্ছবি।

মুর্তজা অতাশ জমজম বলেন, ইরানও তেমনই। এই মাটি আজ হয়তো জালিম ও অশুভ শক্তির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত; কিন্তু এর মানুষের আত্মা সিমুর্গের মতোই ঐক্যের ডানায় ভর করে আবারও উড়বে।

তিনি বলেন, “আমরা দাঁড়িয়ে আছি প্রেম, মানবতা ও মর্যাদাকে রক্ষার জন্য। ঘৃণা থেকে নয়, বিশ্বাস থেকে।”

মুর্তজা অতাশ জমজম বাংলাদেশের সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে ‘ফেরেশতে’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তিনি সর্বশেষ ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন।