• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১২ পিএম


পশ্চিমবঙ্গে সহিংসতার আগুন: শুভেন্দু অধিকারীর সহকারীকে গুলি করে হ-ত্যা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৭ মে ২০২৬ ৬:২৬ পিএম

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষ নেতা শুভেন্দু অধিকারীর এক সহকারী পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় গুলিতে নিহত হয়েছেন।

নিহত চন্দ্রনাথ রাঠ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী। সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে শুভেন্দু অধিকারীকেই সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।

বুধবার রাতে বাড়ি ফেরার পথে রাঠকে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির তদন্ত চলছে, তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

সোমবার নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে পূর্ব ভারতের এই রাজ্যে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। রাঠ নিহত হওয়ার আগেই পুলিশ জানিয়েছিল, সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় ৪০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধে ব্যবহৃত একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে, তবে গাড়িটির নম্বরপ্লেট ভুয়া ছিল।

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের প্রধান সিদ্ধ নাথ গুপ্ত বলেন, “ঘটনাস্থল থেকে আমরা জীবন্ত গুলি ও খোসাও উদ্ধার করেছি।”

একজন প্রত্যক্ষদর্শী গণমাধ্যমকে জানান, মোটরসাইকেলে আসা একজন ব্যক্তি গুলি চালিয়েছিল। তবে এ বিষয়ে বা হামলাকারীর সংখ্যা নিয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

এক বিবৃতিতে তৃণমূল কংগ্রেস এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানায়।

দলটি বলেছে, “গণতন্ত্রে সহিংসতা ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কোনো স্থান নেই। দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।” একই সঙ্গে আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্তের দাবি জানায় তারা।

ভোট-পরবর্তী সহিংসতায় উভয় দলই তাদের কর্মী নিহত হওয়ার দাবি করেছে। বিজেপির দাবি, তাদের দুই কর্মী নিহত হয়েছেন, আর তৃণমূল বলছে, তাদের তিন কর্মী মারা গেছেন। উভয় দলই একে অপরকে দায়ী করছে। তবে রাঠ ছাড়া অন্য নিহতদের রাজনৈতিক পরিচয় পুলিশ নিশ্চিত করেনি।

শুভেন্দু অধিকারীসহ বিজেপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনে পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার বলেন, “আমাদের মুখ্যমন্ত্রী শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং সরকার ক্ষমতায় এলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, যদিও এতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।”

শনিবার পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। যদিও বিজেপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম ঘোষণা করেনি, তবে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া শুভেন্দু অধিকারীকেই সবচেয়ে এগিয়ে মনে করা হচ্ছে।

২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি ২০৭টি আসন জিতে বড় ব্যবধানে জয় পায়। শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও পরাজিত করেন, যা দীর্ঘদিন ধরে তার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল।

এরপর থেকেই রাজ্যজুড়ে বিজয় মিছিল করছে বিজেপি। সমর্থকদের “জয় শ্রীরাম” স্লোগান দিতেও দেখা গেছে।

তবে মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, কলকাতা ও হাওড়াসহ বিভিন্ন জেলা থেকে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ছবি সামনে এসেছে।

তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, বিজেপি কর্মীরা তাদের কয়েকটি দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। যদিও বিজেপি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

রাজধানী কলকাতার একটি বিখ্যাত বাজারে মাংসের দোকান গুঁড়িয়ে দিতে বিজেপি কর্মীরা বুলডোজার নিয়ে গিয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছে তৃণমূল। খাদ্যাভ্যাসের বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল।

তৃণমূলের দাবি, এই ঘটনা “ভয়ভীতি প্রদর্শনের ধারাবাহিকতা” এবং আইনশৃঙ্খলার জন্য “বিপজ্জনক নজির” তৈরি করছে।

বিজেপি সরাসরি এসব মন্তব্যের জবাব না দিলেও দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, দল কোনো ধরনের সহিংসতাকে সমর্থন করে না।

এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা পিটিআই সংবাদ সংস্থাকে জানান, ওই বাজারে বিজেপির বিজয় উদযাপন উপলক্ষে একটি সমাবেশ হয়েছিল, তবে “কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।”

বুধবার এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সহিংসতা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পক্ষ থেকে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষক জাদ মাহমুদ বিবিসিকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বারবার নির্বাচনী সহিংসতার পেছনে রয়েছে গভীরভাবে প্রোথিত “পার্টি সোসাইটি” সংস্কৃতি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য এই ধারণাটি ব্যবহার করেছিলেন দীর্ঘদিনের বাম শাসনামলে কীভাবে রাজনৈতিক দলের পরিচয় গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি স্তর ও জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল, তা বোঝাতে।

জাদ মাহমুদ বলেন, “গত এক দশকে আমরা জাতপাত বা ধর্মের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে বেশি নির্যাতন দেখেছি।” তার মতে, অনেক গ্রামীণ এলাকায় টিকে থাকাটাই দলীয় আনুগত্যের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তন অনেকের কাছে অস্তিত্বের সংকটের মতো মনে হয়।

তিনি আরও বলেন, আগের নির্বাচনের তুলনায় এবারের ভোটে মৃত্যুর সংখ্যা কম হলেও সহিংসতা শুধু প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভোটের আগে, ভোট চলাকালে এবং ভোটের পরও ভয়ভীতির একটি বিস্তৃত পরিবেশ তৈরি করে।