ইসবগুলের ভুসি বহু বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে পরিচিত একটি প্রাকৃতিক উপাদান। কোষ্ঠকাঠিন্যসহ পেটের বিভিন্ন সমস্যায় এটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে। অন্যদিকে, গত এক দশকে চিয়া বীজ বিশ্বজুড়ে ‘সুপারফুড’ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। স্মুদি, ওটস কিংবা দইয়ের সঙ্গে চিয়া বীজ মিশিয়ে খাওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে।
ফাইবার বা আঁশের চাহিদা পূরণে ইসবগুল ও চিয়া বীজের মধ্যে কোনটি বেশি কার্যকর—এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে এর সরল কোনো উত্তর নেই। কারণ দুটি উপাদান শরীরে ভিন্নভাবে কাজ করে এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্যও এক নয়।
দুটির মধ্যে বড় পার্থক্য হলো, চিয়া বীজ একটি সম্পূর্ণ খাবার বা ‘হোল ফুড’, আর ইসবগুল মূলত ঘনীভূত আঁশের একটি সাপ্লিমেন্ট।
চিয়া বীজে শুধু ফাইবার নয়, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজও রয়েছে। ফলে প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে এটি একটি পুষ্টিকর উপাদান হিসেবে যোগ করা যায়।
অন্যদিকে, ইসবগুলের ভুসিতে প্রধানত দ্রবণীয় বা সলিউবল আঁশ থাকে, যা অত্যন্ত সান্দ্র। পানির সংস্পর্শে এলে এটি জেলের মতো আকার ধারণ করে। পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এই জেল মলের গঠন ও নিয়মিততা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
ইসবগুলের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পানি শোষণ করে সান্দ্র জেল তৈরি করা। এর ফলে মলের পরিমাণ বাড়ে এবং পানি ধরে রাখার কারণে মল নরম হয়ে সহজে বের হতে সাহায্য করে।
এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায় ইসবগুল ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্ত্রের নিয়মিততা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইসবগুলের ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের ইতিহাসও চিয়া বীজের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত।
চিয়া বীজেও দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয়—দুই ধরনের আঁশ রয়েছে। এগুলো মলের পরিমাণ বাড়িয়ে নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করতে পারে। তবে সাধারণভাবে এর প্রভাব ইসবগুলের তুলনায় তুলনামূলকভাবে মৃদু ও ধীরগতির।
তবে হঠাৎ করে বেশি পরিমাণ ফাইবার খাওয়া শুরু করলে গ্যাস, পেট ফাঁপা কিংবা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে আঁশের পরিমাণ কম, তাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি হতে পারে।
ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা আইবিএসের উপসর্গ সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। কারও ক্ষেত্রে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান সমস্যা, আবার কারও ক্ষেত্রে ডায়রিয়া দেখা যায়। পেট ফাঁপা ও পেটব্যথাও আইবিএসের সাধারণ উপসর্গ।
ইসবগুলের মতো দ্রবণীয় আঁশ ব্যবহারে সামগ্রিক আইবিএসের উপসর্গ, বিশেষ করে কোষ্ঠকাঠিন্য-প্রধান আইবিএসের ক্ষেত্রে উন্নতির পক্ষে প্রমাণ রয়েছে। তবে এটি সবার জন্য একইভাবে কার্যকর হবে এমন নয়। একজনের আইবিএসের ধরন, উপসর্গ এবং ফাইবার সহ্য করার ক্ষমতার ওপর এর কার্যকারিতা নির্ভর করতে পারে।
ইসবগুলের উপকারিতা শুধু মলত্যাগের নিয়মিততা বজায় রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিপাকতন্ত্রে এটি জেল তৈরি করায় খাবারের পর গ্লুকোজ শোষণের গতি কমাতে পারে।
গবেষণায় নিয়মিত ইসবগুল গ্রহণের সঙ্গে এলডিএল বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল কিছুটা কমে যাওয়ার সম্পর্কও দেখা গেছে।
চিয়া বীজও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সুবিধা মূলত এর সামগ্রিক পুষ্টিগুণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে থাকা আঁশ, প্রোটিন ও চর্বির সমন্বয় খাবারকে বেশি তৃপ্তিদায়ক করে তুলতে পারে। পাশাপাশি চিয়া বীজে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও বাড়তি পুষ্টিগত সুবিধা দেয়।
সামাজিক মাধ্যমে ইসবগুলকে পেট ফাঁপার সার্বজনীন সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। বরং খুব দ্রুত বেশি পরিমাণ ফাইবার গ্রহণ করলে পেট ফাঁপা ও গ্যাসের সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
খাদ্যতালিকায় আঁশের পরিমাণ কম থাকলে ধীরে ধীরে তা বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত পানি পান করাই নিরাপদ পদ্ধতি। আর দীর্ঘদিন ধরে পেট ফাঁপা থাকা বা এর কোনো স্পষ্ট কারণ না থাকলে শুধু ফাইবার খেয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কোনটি গ্রহণ করবেন, তা মূলত আপনার প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে।
প্রতিদিনের খাবারে ফাইবারের পাশাপাশি প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাট এবং বিভিন্ন খনিজ যোগ করতে চাইলে চিয়া বীজ ভালো একটি বিকল্প। দই, ওটস কিংবা স্মুদির সঙ্গে সহজেই এটি খাওয়া যায়।
অন্যদিকে, লক্ষ্য যদি হয় দ্রবণীয় আঁশের পরিমাণ বাড়ানো, মলের গঠন উন্নত করা কিংবা অন্ত্রের নিয়মিততা বজায় রাখা, তাহলে ইসবগুল বেশি কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক হতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য এবং নির্দিষ্ট কিছু আইবিএস উপসর্গের ক্ষেত্রেও ইসবগুলের ক্লিনিক্যাল প্রমাণ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।
অর্থাৎ ইসবগুল ও চিয়া বীজকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। দুটির ব্যবহার ও উপকারের ক্ষেত্র আলাদা। তাই সামাজিক মাধ্যমে কোনো ভাইরাল ভিডিও দেখে হঠাৎ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করার বদলে নিজের খাদ্যাভ্যাস এবং অন্ত্রের প্রয়োজন কী, সেটিই আগে বিবেচনা করা উচিত।
ইসবগুল খাদ্যতালিকায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসবগুল পানি শোষণ করে ফুলে ওঠে। তাই পর্যাপ্ত তরল ছাড়া এটি গ্রহণ করলে গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
সাধারণভাবে ১-২ চা চামচ ইসবগুল অন্তত এক গ্লাস, অর্থাৎ প্রায় ২৪০ মিলিলিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পান করার কথা বলা হয়। পাশাপাশি সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি।
যাদের খাবার গিলতে সমস্যা রয়েছে কিংবা অন্ত্রে বাধা বা সংকীর্ণতা থাকার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ইসবগুল শুরু করা উচিত নয়।
এ ছাড়া যারা নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন, তাদের ক্ষেত্রেও ওষুধের সঙ্গে ফাইবার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের মধ্যে সময়ের ব্যবধান রাখা প্রয়োজন কি না, সে বিষয়ে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
/এসএন