• ঢাকা
  • সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম


দ্রুত বাড়ছে এআই-চালিত হ্যাকিং

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৫ মে ২০২৬ ১১:৪৪ এএম

২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর জাপানের ওসাকায় ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে দেশটির ‘Unauthorized Access Prohibition Act’-এর আওতায় গ্রেপ্তার করা হয়। সে জাপানের সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট ক্যাফে চেইন Kaikatsu Club-এর ৭ মিলিয়নেরও বেশি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের জন্য ক্ষতিকর কোড চালিয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, এই হ্যাকিংয়ের পেছনে তার উদ্দেশ্য ছিল Pokémon কার্ড কেনা।

ঘটনাটি একদিকে সাধারণ মনে হলেও এর মধ্যে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। অতীতে Kevin Mitnick-এর মতো প্রযুক্তি-দক্ষ হ্যাকারদের গল্প শোনা যেত, যারা দক্ষতার পাশাপাশি অপরিণত সিদ্ধান্তের কারণে সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়তেন। কিন্তু এই ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোরটি প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ ছিল না।

এআই-সহায়তায় সাইবার হামলার উত্থান

২০২৫ সালে LLM-নির্ভর চ্যাট ও এজেন্ট সিস্টেমগুলো এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এগুলো আর শুধু কোডিং সহায়ক টুল নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ কোড তৈরির সক্ষমতা অর্জন করে। এর ফলে সাইবার অপরাধের সংখ্যা ও তীব্রতা প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পাবলিক রিপোজিটরিতে ক্ষতিকর প্যাকেজের সংখ্যা ৭৫% বেড়েছে, ক্লাউডে অনুপ্রবেশ ৩৫% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এআই-নির্ভর ফিশিং আক্রমণ মানবনির্ভর নিরাপত্তা দলের চেয়েও কার্যকর হয়ে উঠেছে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে হামলাকারীদের প্রোফাইলে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৪, ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী তিন কিশোর, যাদের কোনো কোডিং জ্ঞান ছিল না, তারা ChatGPT ব্যবহার করে একটি টুল তৈরি করে Rakuten Mobile-এর সিস্টেমে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার বার আক্রমণ চালায়। তারা এই কার্যক্রম থেকে অর্জিত অর্থ গেমিং কনসোল ও অনলাইন জুয়ায় ব্যয় করে।

একই বছরের জুলাইয়ে একজন ব্যক্তি Claude Code নামের উন্নত এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এক মাসে ১৭টি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাঁদাবাজিমূলক সাইবার হামলা চালায়। সে এআই ব্যবহার করে ক্ষতিকর কোড তৈরি, চুরি করা ফাইল সংগঠিত করা, আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং চাঁদা দাবির ইমেইল প্রস্তুত করে।

ডিসেম্বর ২০২৫-এ আরেক ব্যক্তি Claude Code এবং ChatGPT ব্যবহার করে মেক্সিকো সরকারের ১০টিরও বেশি সংস্থায় অনুপ্রবেশ করে এবং ১৯৫ মিলিয়নেরও বেশি করদাতার তথ্য চুরি করে।

যদিও এসব ধরনের হামলা আগে সম্ভব ছিল, এখন একক ব্যক্তির মাধ্যমে এমন জটিল হামলা চালানো সম্ভব হচ্ছে, যা আগে সংগঠিত দলের কাজ হিসেবে বিবেচিত হতো। একইসঙ্গে প্রযুক্তিগত জ্ঞান না থাকা ব্যক্তিরাও এখন ছোট পরিসরে হামলা চালাতে পারছে, যা আগে দক্ষ হ্যাকারদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল।

সাইবার ঝুঁকির দ্রুত বিস্তার

২০২৫ সালে বট কার্যক্রম, ম্যালওয়্যার, লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ এবং ফিশিংয়ের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। একই সময়ে LLM প্রযুক্তির সক্ষমতাও দ্রুত উন্নত হয়।

Sonatype-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে পাবলিক রিপোজিটরিতে ৫৫ হাজার ক্ষতিকর প্যাকেজ ছিল, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৬০০-তে। বিশেষ করে ২০২৩ (GPT-4 প্রকাশের বছর) এবং ২০২৫ সালে এই বৃদ্ধির হার ছিল উল্লেখযোগ্য।

এছাড়া ‘time to exploit’ বা কোনো দুর্বলতা প্রকাশের পর সেটি কাজে লাগাতে হামলাকারীদের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২০ সালে যেখানে এটি ছিল ৭০০ দিনের বেশি, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৪ দিনে।

Mandiant-এর M-Trends ২০২৬ রিপোর্টে বলা হয়েছে, এখন অনেক ক্ষেত্রে প্যাচ প্রকাশের আগেই আক্রমণের কোড তৈরি হয়ে যাচ্ছে। প্রায় ২৮.৩% CVE প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

যদিও এআই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও দ্রুততর করেছে, তথ্যে দেখা যায় আক্রমণকারীরাই এগিয়ে রয়েছে। Edgescan ২০২৫ রিপোর্ট অনুযায়ী, গুরুতর দুর্বলতা ঠিক করতে গড়ে ৭৪ দিন সময় লাগছে। এছাড়া বড় প্রতিষ্ঠানের ৪৫% দুর্বলতা কখনোই সমাধান করা হয় না।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে Shai-Hulud নামের একটি আক্রমণে npm ইকোসিস্টেমের ৫০০-এর বেশি প্যাকেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ৪৮৭টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য ফাঁস হয় এবং Trust Wallet থেকে ৮.৫ মিলিয়ন ডলার চুরি হয়।

এদিকে এআই-নির্মিত ক্ষতিকর কোড এতটাই বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব কোডে ডকুমেন্টেশন, টেস্ট এবং স্বাভাবিক সফটওয়্যারের মতো কাঠামো থাকায় নিরাপত্তা স্ক্যানার সহজে শনাক্ত করতে পারছে না।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শুধু দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলে এসব হামলা ঠেকানো সম্ভব নয়। কারণ দুর্বলতা কাজে লাগানোর সময় কমছে এবং এআই-নির্মিত ম্যালওয়্যার সহজেই প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিচ্ছে।

আগে সাইবার হামলা চালানোর ইচ্ছা এবং সক্ষমতা একসঙ্গে থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই কম, কিন্তু এখন তা দ্রুত বাড়ছে। একইসঙ্গে সফটওয়্যার তৈরির গতি বাড়ায় ঝুঁকিও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি আক্রমণের সঙ্গে লড়াই করার পরিবর্তে পুরো দুর্বলতার ধরনগুলোই নির্মূল করার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। এ ধরনের পদ্ধতিই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।