ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিটি (ডিবিআইডি) নিবন্ধন ছাড়া ফেসবুক, ইউটিউব, গুগলসহ কোনো বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নতুন করে অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না। একই সঙ্গে বিদেশি কোনো ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে চাইলে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে ডিবিআইডি নিবন্ধন নিতে হবে এবং দেশের প্রচলিত ভ্যাট, আয়কর ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে।
এসব বিধান অন্তর্ভুক্ত করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬’-এর পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই খসড়ার ওপর আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও সাধারণ মানুষের সুনির্দিষ্ট মতামত আহ্বান করা হয়েছে। মতামত পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত খসড়া আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন দাপ্তরিক কর্মকর্তারা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, দেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও এ খাতে সুস্পষ্ট ও দিকনির্দেশনামূলক নীতিমালার অভাবে সরকার নিয়মিত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এ কারণেই সময়োপযোগী ও সমন্বিত একটি নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। অংশীজনদের গঠনমূলক মতামত বিবেচনায় নিয়ে এটি চূড়ান্ত করা হবে।
কয়েক বছর আগে মেটা, গুগল, অ্যামাজন ও নেটফ্লিক্সের মতো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ করে প্রতিনিধি বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল এবং কর পরিশোধ শুরু করে।
প্রকাশিত খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার আগে বিদেশি ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিটি (ডিবিআইডি) নিবন্ধন নিতে হবে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনলাইনে খুচরা বিক্রি বা যেকোনো ধরনের ডিজিটাল বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিবন্ধনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দেশের প্রচলিত ভ্যাট, আয়কর এবং অন্যান্য কর-সংক্রান্ত আইনি বিধানও অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করতে হবে।
নীতিমালাটি কার্যকর হলে মেটা, গুগল, ইউটিউবসহ অন্যান্য বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ছাড়া বাংলাদেশে নতুন কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না। তবে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নিবন্ধন গ্রহণের পর বাংলাদেশে বৈধভাবে আমদানি করা পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন দেশের প্রচলিত আইন মেনে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার করা যাবে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা ও বিধি-বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
খসড়া নীতিমালায় দেশের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) ডিজিটাল মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি বাড়াতে বিশেষ নীতিসহায়তা, পার্সেলভিত্তিক আধুনিক রপ্তানির পূর্ণ সুবিধা এবং উপযুক্ত বীমাব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে অর্জিত আন্তর্জাতিক রপ্তানি আয়কে প্রচলিত রপ্তানি আয়ের মতোই স্বীকৃতি দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া দেশে ও বিদেশে দ্রুত প্রসেসিং সেন্টার এবং আন্তর্জাতিক মানের গুদামজাত অবকাঠামো গড়ে তুলতে নীতিগত সহায়তার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
নীতিমালায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নকল, ভেজাল ও প্রতারণামূলক পণ্য বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক সব ধরনের অনৈতিক জুয়া, লটারি, বেটিং এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি নীতিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত যেকোনো পণ্য বা সেবার ডিজিটাল বাণিজ্য থেকেও বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া এমন কোনো চটকদার বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ডিজিটাল বাজারের শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে অথবা সাধারণ ভোক্তাকে বিভ্রান্ত বা প্রতারিত করতে পারে।
খসড়ায় ব্যবসা-টু-ব্যবসা (বি-টু-বি), ব্যবসা-টু-ভোক্তা (বি-টু-সি) এবং বি-টু-বি-টু-সি ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ডিজিটাল আমদানির সুযোগ আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনলাইনে সরাসরি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান মূল্যসীমা যৌক্তিক পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ বা পুনর্বিবেচনার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে দ্রুত সমন্বয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্য ত্রুটিপূর্ণ হলে তা ফেরত দেওয়া বা পুনরায় রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম অনুসরণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনকে সহজ ও নিরাপদ করতে বৈশ্বিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সঙ্গে দেশের বিদ্যমান ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর প্রযুক্তিগত সংযোগ স্থাপন এবং অনলাইন লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘ক্রস-বর্ডার এসক্রো’ সেবা চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আয় দ্রুত দেশে আনা এবং আমদানি ব্যয় পরিশোধ সহজ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায়ও একাধিক বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়েছে। বিক্রয়োত্তর সেবা, মূল্য ফেরত, পণ্য ফেরত, ওয়ারেন্টি ও গ্যারান্টি সম্পর্কে ক্রেতাকে কেনাকাটার আগেই স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে। সরবরাহ করা পণ্য প্রদর্শিত বর্ণনার সঙ্গে না মিললে কিংবা ত্রুটিপূর্ণ বা নকল প্রমাণিত হলে বিক্রেতাকে তাৎক্ষণিকভাবে পণ্য ফেরত নিয়ে ক্রেতার সম্পূর্ণ অর্থ দ্রুত ফেরত দিতে হবে।
এ ছাড়া ডিজিটাল বাণিজ্যসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর-এর ডিজিটাল অভিযোগ ও সেবা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও খসড়া নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
/এসএন