• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৯ পিএম


তরুণদের আদর্শ জীবন গঠনে মহানবী (সা.)-এর ৫ গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৮ অক্টোবর ২০২৬ ৭:০৩ পিএম

তরুণ বয়স মানুষের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এই সময়ের চিন্তাভাবনা, অভ্যাস, চরিত্র ও মূল্যবোধ ভবিষ্যৎ জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই তরুণদের মেধা, সামর্থ্য ও উদ্যমকে সঠিক পথে পরিচালিত করা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ইসলামেও তারুণ্যের সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তরুণদের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্বশীলতা, আত্মসংযম, নৈতিকতা ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর জীবন ও বিভিন্ন নির্দেশনায় রয়েছে এমন কিছু দিকনির্দেশনা, যা তরুণদের আদর্শ জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।১. সামাজিক সংহতি গড়ে তোলামহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (তিরমিজি)সংক্ষিপ্ত এই হাদিসের মধ্যে তরুণ ও প্রবীণ—দুই প্রজন্মের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। ছোটদের প্রতি দয়া এবং বড়দের প্রতি সম্মান একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ছোটদের প্রতি ভালোবাসা, মনোযোগ, আস্থা ও ক্ষমাশীল আচরণ তাদের বিকাশে সহায়ক হয়।তরুণদের ক্ষমতায়নের অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি হলো তাদের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রাখা এবং দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া। মহানবী (সা.) তরুণ সাহাবিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে তাদের যোগ্যতার ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন।এর অন্যতম উদাহরণ মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহানবী (সা.) তাকে ইয়াসরিবের মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মানুষকে ইসলামের শিক্ষা দিয়েছেন এবং তাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর দাওয়াত ও প্রচেষ্টার ফলে অনেক মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তী সময়ে ইয়াসরিব মদিনা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।তরুণদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটি হওয়া স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতিতে তাদের প্রতি ক্ষমাশীল ও সহানুভূতিশীল আচরণ তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তরুণদেরও প্রবীণদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসাই দুই প্রজন্মের মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।২. তরুণদের উদ্যমের সঙ্গে বয়স্কদের প্রজ্ঞার সমন্বয়তারুণ্য এমন একটি সময়, যখন মানুষের কর্মশক্তি, উদ্যম ও নতুন কিছু করার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি থাকে। জীবনের উদ্দেশ্য খোঁজা, নতুন কিছু শেখা এবং সমাজে ভূমিকা রাখার আকাঙ্ক্ষাও এ সময় প্রবল থাকে।তবে উদ্যমের সঙ্গে প্রজ্ঞা ও সংযমের সমন্বয় না থাকলে সেই শক্তি ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ও বিভিন্ন তথ্যের সহজলভ্যতার কারণে তরুণরা পরিচয়, সংস্কৃতি, ধর্ম ও জীবন সম্পর্কে নানা ধরনের তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছে। এর মধ্যে ভুল ও উগ্রপন্থী তথ্যও থাকতে পারে।তাই কোনো আহ্বান বা বক্তব্য আবেগকে নাড়া দিলেই সেটিকে সত্য কিংবা ন্যায়সঙ্গত ধরে নেওয়া উচিত নয়। ন্যায়বিচারের নামে কোনো কাজ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে প্রয়োজন জ্ঞান, সংযম, শৃঙ্খলা ও সমালোচনামূলক চিন্তা।ন্যায়বিচার হলো কোনো বিষয়কে তার যথাযথ স্থানে স্থাপন করা। আর কোনো বিষয়কে যথাযথ জায়গায় কীভাবে স্থাপন করতে হবে, সে উপলব্ধিই প্রজ্ঞা। এজন্য তরুণদের এমন বয়স্ক ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে জ্ঞান নেওয়া প্রয়োজন, যাদের মধ্যে জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় রয়েছে।৩. সময়ের মূল্য বুঝতে হবেশক্তি, উদ্যম ও সময়—সবই আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। একজন কৃতজ্ঞ মানুষ এসব মূল্যবান নিয়ামত অযথা নষ্ট করে না। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি, ইবাদত, জ্ঞান অর্জন ও মানুষের কল্যাণে সেগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচটি জিনিসের আগে পাঁচটি জিনিসকে মূল্য দাও—বার্ধক্যের আগে তোমার যৌবনকে, অসুস্থতার আগে তোমার সুস্থতাকে, দারিদ্র্যের আগে তোমার সম্পদকে, ব্যস্ততার আগে অবসর সময়কে এবং মৃত্যুর আগে জীবনকে।’ (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)এই নির্দেশনা তরুণদের জন্য সময়ের গুরুত্ব বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। যৌবন ও কর্মক্ষমতার সময়টি একবার চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না। তাই জীবনের এই সোনালি সময়ে জ্ঞান অর্জন, আত্মউন্নয়ন, সমাজের কল্যাণে অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালনে মনোযোগ দেওয়া উচিত।সময় এমন একটি সম্পদ, যা একবার অতীত হয়ে গেলে কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই তরুণদের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করা প্রয়োজন।৪. জ্ঞান অর্জনে মনোযোগী হওয়াজ্ঞান অর্জনের জন্য তারুণ্য অত্যন্ত উপযোগী সময়। এ বয়সে মানুষের কর্মশক্তি বেশি থাকে এবং সাধারণত দায়িত্বও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে শেখা, পড়াশোনা ও নিজেকে দক্ষ করে তোলার জন্য তরুণ বয়সকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মহানবী (সা.)-এর এই তরুণ সাহাবি জ্ঞান অর্জনের প্রতি গভীর মনোযোগী ছিলেন। তিনি বয়স্ক সাহাবিদের কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণ করে পরবর্তী সময়ে জ্ঞানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। বয়সে প্রবীণ হওয়ার পরও মানুষ তাঁর জ্ঞান ও মতামতের জন্য তাঁর কাছে আসত।মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ (মুসলিম)তরুণদের জন্য ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, শরিয়াহর বিধান ও একাডেমিক জ্ঞানের সমন্বিত শিক্ষা একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে শুধু বাহ্যিক জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট নয়; নিজের অন্তর্জগত ও চরিত্র সম্পর্কেও সঠিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই শরীরে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে। সেটি ভালো হলে পুরো শরীর ভালো হয়ে যায়, আর সেটি নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়।’ (বুখারি)এই হাদিস মানুষের অন্তরের সঙ্গে তার বাহ্যিক কর্মকাণ্ডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে। তাই অন্যকে পরিবর্তনের পাশাপাশি নিজের চরিত্র, চিন্তা ও অভ্যাস সংশোধনের দিকেও তরুণদের সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।৫. সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করাতরুণদের শক্তি, মেধা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানোর অন্যতম কার্যকর উপায় হলো সমাজের বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া। তরুণদের উদ্যম ও নতুন চিন্তা সমাজের অগ্রগতি ও কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।তবে সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আগে নিজের মধ্যে সঠিক জ্ঞানের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন। জ্ঞান ও নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় অংশ নেওয়া মানুষের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরাই মানবজাতির কল্যাণের জন্য আবির্ভূত শ্রেষ্ঠ জাতি।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)তাই তরুণদের উচিত নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যকে ইতিবাচক কাজে নিয়োজিত করা, জ্ঞান অর্জন করা, সময়ের মূল্য দেওয়া, প্রবীণদের কাছ থেকে প্রজ্ঞা গ্রহণ করা এবং সমাজের কল্যাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা অনুসরণ করে তারুণ্যের শক্তিকে সঠিক পথে কাজে লাগাতে পারলে তা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্যই কল্যাণকর হতে পারে।

/বিএসএস