শুক্রবারে মারা গেলে কি কবরের আজাব মাফ হয়?
ইসলামে জুমার দিন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় এ দিনের ইবাদত ও আমলের গুরুত্বও অনেক বেশি। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) জুমার দিনকে শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ কারণে মুসলমানদের মধ্যে এ দিনকে ঘিরে রয়েছে বিশেষ আগ্রহ ও আবেগ। তবে শুক্রবারে কেউ মারা গেলে তাঁর কবরের আজাব মাফ হয়ে যায় কি না, কিংবা তিনি বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন কি না—এ নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে।ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণকারীর জন্য কবরের ফেতনা থেকে সুরক্ষার বিশেষ সুসংবাদ রয়েছে। তবে শুক্রবারে মারা গেলেই কেউ নিশ্চিতভাবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন কিংবা কেয়ামত পর্যন্ত তাঁর কবরের আজাব বন্ধ থাকবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই।জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদাজুমার দিন মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিনে বিশেষ ইবাদত, জুমার নামাজ আদায়, দরুদ পাঠ ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা।হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম দিন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৪)এ দিনের বিশেষ মর্যাদার কারণে শুক্রবারে মৃত্যুবরণ করাকে অনেকে সৌভাগ্যের বিষয় বলে মনে করেন। তবে এ বিষয়ে প্রচলিত ধারণা ও শরিয়তের দলিলের মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি।শুক্রবারে মারা গেলে কবরের আজাব থেকে মুক্তি মেলে?রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যদি জুমার দিনে অথবা জুমার রাতে মারা যায়, আল্লাহ তাকে কবরের ফেতনা থেকে রক্ষা করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, সুনানে তিরমিজি, মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ১৩৬৭)এই হাদিসের ভিত্তিতে ইসলামি বিশেষজ্ঞরা শুক্রবারে বা জুমার রাতে মৃত্যুবরণকারীর জন্য বিশেষ সুসংবাদের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে হাদিসে বর্ণিত কবরের ফেতনা থেকে সুরক্ষার বিষয়টিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয় যে, ওই ব্যক্তি নিশ্চিতভাবেই জান্নাতি হয়ে যাবেন অথবা তাঁর কবরের আজাব কেয়ামত পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।হানাফি মাজহাবের বিশিষ্ট পণ্ডিত ও সুফি মোল্লা আলি কারি (রহ.) এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণকারীর কবরের আজাব উঠিয়ে নেওয়া হয়। তবে কেয়ামত পর্যন্ত সেই আজাব আর ফিরে আসবে না—এমন বক্তব্যের ভিত্তি তাঁর জানা নেই। (মিনাহুর রাওদিল আজহার ফি শরহি ফিকহিল আকবার, পৃষ্ঠা: ২৯৫-২৯৬)শুক্রবারে মৃত্যু হলেই কি জান্নাত নিশ্চিত?শুক্রবারে মারা যাওয়া ব্যক্তির জন্য জান্নাত নিশ্চিত—এমন কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। একইভাবে এ দিন ছাড়া অন্য কোনো দিনে মৃত্যুবরণ করাকে দুর্ভাগ্য বা খারাপ পরিণতির লক্ষণ বলারও সুযোগ নেই।ইসলামি ফিকাহবিদ ও মুজাদ্দিদ ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.)-এর আলোচনায় জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা এবং এ দিনে জাহান্নামের কার্যক্রমসংক্রান্ত বর্ণনার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মুশরিক ও মুনাফিকরা স্থায়ীভাবে কবরের শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন। (মিরআত, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৪৪১)কবরকে আখেরাতের প্রথম ধাপ হিসেবে উল্লেখ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কবর হলো আখেরাতের ঘাঁটিগুলোর মধ্যে প্রথম ঘাঁটি। এই ঘাঁটিতে যদি কারও জন্য প্রশ্নোত্তর সহজ করে দেওয়া হয়, তাহলে পরবর্তী ধাপগুলোও তাঁর জন্য সহজ হবে বলে আশা করা যায়।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ১২৫)এ বিষয়ে কী বলেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ?আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ ইউটিউবে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, জুমার দিন কেউ মারা গেলে তিনি কবরের আজাব ও কবরের প্রশ্নোত্তর থেকে নিরাপদ থাকতে পারেন। অর্থাৎ, কবরের ফেতনা থেকে সুরক্ষার বিষয়ে হাদিসে বিশেষ সুসংবাদ রয়েছে।তবে শুক্রবারে মারা গেলেই কোনো ব্যক্তি জান্নাতি হবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, শুক্রবারেও অনেক কাফের ও পাপাচারী ব্যক্তির মৃত্যু হয়। আবার শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের অন্য কোনো দিনে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে খারাপ পরিণতির অধিকারী বলারও সুযোগ নেই।তাহলে শুক্রবারে মৃত্যু হলে কী মনে করা উচিত?ইসলামি বর্ণনার আলোকে জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণ করাকে একজন মুসলমানের জন্য আশাব্যঞ্জক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে কারও চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করা উচিত নয়। বরং মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও জান্নাত কামনা করা এবং তাঁর ব্যাপারে ভালো ধারণা রাখা উচিত।সুতরাং, শুক্রবারে মারা গেলে কবরের ফেতনা থেকে সুরক্ষার সুসংবাদ রয়েছে। কিন্তু এ কারণে বিনা হিসাবে জান্নাত লাভ কিংবা কেয়ামত পর্যন্ত কবরের আজাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকার নিশ্চয়তা দেওয়া সঠিক নয়।
/বিএসএস