সাবেক পাসপোর্ট কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের জীবনজুড়ে ছিল বিতর্ক, দুর্নীতির অভিযোগ এবং অঢেল সম্পদের গল্প। কর্মজীবনের শুরুতেই সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে তার। পরে দুর্নীতির মামলায় কারাবরণ করতে হয়। শেষ পর্যন্ত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আকস্মিক মৃত্যু হয় তার। তবে মৃত্যুর পরও থামেনি আলোচনা। সম্প্রতি তার একমাত্র ছেলে আল মুক্কাবির ইসলাম অর্ণবের (৩২) রহস্যজনক মৃত্যুর পর আবারও আলোচনায় এসেছে রফিকুল ইসলামের বিপুল সম্পদ।
স্বজন ও সাবেক সহকর্মীদের অনেকে বলছেন, দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে তোলা এত সম্পদের শেষ পরিণতি করুণই হয়েছে। জীবদ্দশায় রফিকুল ইসলাম নিজেও সেই সম্পদের ভোগ করতে পারেননি। আর এখন সম্পত্তি ঘিরে টানাপোড়েনের মধ্যেই একমাত্র ছেলের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে।
পরিবারের সদস্য হিসেবে বর্তমানে তার দুই কন্যা জীবিত রয়েছেন। তাদের একজন বিদেশে অবস্থান করছেন। অন্যজন দেশে থাকলেও মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী সম্পদের একটি বড় অংশ নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ২ মে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে অর্ণবের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকেই তার মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন ও রহস্য তৈরি হয়েছে। পরিবারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের দাবি, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরেই অর্ণবকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতে পারে অথবা তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
অর্ণবের বাবা রফিকুল ইসলাম পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন। চাকরিজীবনের শেষদিকে তিনি অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) পদে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকরির সুবাদে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন তিনি।
তার সম্পদের মধ্যে রয়েছে রাজধানীর ধানমন্ডির ৮/এ নম্বর রোডে একটি ফ্ল্যাট, ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে আরেকটি ফ্ল্যাট, সেগুনবাগিচার ইস্টার্ন ড্রিম ভবনে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট, উত্তরায় একটি ফ্ল্যাট এবং মালিবাগের মীরবাগ এলাকায় পাঁচতলা বাড়ি।
এ ছাড়া রাজধানীর ডেমরায় তার নামে প্রতিষ্ঠিত ‘রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ রয়েছে। গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের আকবপুরে প্রায় ১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ‘উমেদ আলী ভুঁঞা উচ্চবিদ্যালয়’ এবং নীলগঞ্জে আড়াই একর জমির ওপর ‘রফিকুল ইসলাম কলেজ’ রয়েছে।
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, কিশোরগঞ্জের খালিয়াজুড়িতে প্রায় ১০০ একর কৃষিজমি ও খামারবাড়ি, তাড়াইলে ২০ একর জমি, একটি দোতলা বাড়ি এবং কিশোরগঞ্জ শহরে ১০ শতাংশ জমিসহ বিপুল ভূসম্পত্তিরও মালিক ছিলেন তিনি।
সূত্র জানায়, বয়স জালিয়াতির অভিযোগে ২০১৬ সালে চাকরি হারান রফিকুল ইসলাম। পরে দুদকের মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারেও যেতে হয় তাকে। কয়েক মাস পর জামিনে মুক্তি পেলেও ২০১৭ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। এরপর থেকেই তার সম্পদের মালিকানা ও দেখভাল নিয়ে পারিবারিক জটিলতা শুরু হয়।
জীবিত অবস্থায় রফিকুল ইসলামের বিপুল সম্পদের বড় অংশ দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন তার ছোট ভাই ওসমান গনি। তিনি একসময় পুলিশে এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে আলোচিত রুবেল হত্যা মামলায় জড়িয়ে চাকরি হারান। পরে রফিকুল ইসলাম তাকে নিজের সম্পদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখাশোনার দায়িত্ব দেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবার মৃত্যুর পর অর্ণব পৈতৃক সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলে চাচা ও কয়েকজন আত্মীয়ের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। বিশেষ করে চাচা ওসমান গনি, জাহিদ মিয়া ও হারুনের সঙ্গে তার মতবিরোধ বাড়তে থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, অর্ণবকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রিতেও বাধা দেওয়া হতো। এসব বিষয় নিয়ে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন বলেও দাবি পরিবারের কয়েকজন সদস্যের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্ণবের এক মামা বলেন, তার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে সম্পত্তির বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা জরুরি। তার দাবি, সম্পত্তির লোভ থেকেই হয়তো তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আবার এমনও হতে পারে, নানা চাপে তাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় যে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন।
তিনি আরও বলেন, অর্ণবের মোবাইল ফোন, ব্যাংক হিসাব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
অর্ণবের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে। ফুটেজে দেখা গেছে, মৃত্যুর কিছু সময় আগে অর্ণব একা ভবনের ছাদে ওঠেন। সেখানে অন্য কাউকে দেখা যায়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্ণবের কক্ষ থেকে মাদকসেবনের কিছু আলামত, স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট ও কয়েক ধরনের ওষুধ উদ্ধার করা হয়েছে। তার প্যান্টের পকেট থেকে দুটি মোবাইল ফোনও পাওয়া গেছে। পড়ে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রযুক্তিগত সহায়তায় সেখান থেকে তথ্য উদ্ধার সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার জিসানুল হক বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। সম্পত্তি বিরোধ বা অন্য কোনো কারণে কেউ তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিগগিরই মোবাইল ফোনের ডেটা ও কললিস্ট পরীক্ষা করা হবে।
তবে পরিবারের অনেক সদস্য এখনো আত্মহত্যার বিষয়টি মানতে নারাজ। তাদের প্রশ্ন, সুস্থ-স্বাভাবিক একজন যুবক হঠাৎ কেন এমন সিদ্ধান্ত নেবেন? এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য থাকতে পারে বলেই তারা মনে করছেন।
অর্ণবের বাসায় একজন গাড়িচালক ও দুই গৃহকর্মী থাকতেন। প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদের দাবিও তুলেছেন পরিবারের সদস্যরা।
এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধানমন্ডি থানার এসআই রাজিব হাসান জানিয়েছেন, এখনো ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন হাতে এলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, অর্ণবের মা ও দুই বোন এখনো শোকাহত। তাদের সঙ্গে কথা বলাও তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
/এসএন