• ঢাকা
  • রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম


শাপলা চত্বর হ’ত্যাকাণ্ড ছিল ‘পরিকল্পিত অপরাধ’: শেখ হাসিনাকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ বলছে প্রসিকিউশন

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৩ মে ২০২৬ ৪:৩৯ পিএম

মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে দেশের ইতিহাসের একটি কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। তদন্তে উঠে এসেছে, ওই দুই দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৫৮ জন নিরপরাধ আলেম নিহত হন।

প্রসিকিউশনের দাবি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিকল্পনায় এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল এবং তিনিই ছিলেন ঘটনার ‘মাস্টারমাইন্ড’। তদন্তে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তে শুধু হত্যাকাণ্ডের তথ্যই নয়, ওই ঘটনার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার পাশাপাশি আরও প্রায় ৩০ জনকে আসামি করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

প্রসিকিউশন জানিয়েছে, মামলার প্রায় ৯০ শতাংশ তদন্ত শেষ হয়েছে এবং শিগগিরই ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। আগামী ৭ জুন প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারিত রয়েছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম রোববার যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনাই এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী এবং তাকে প্রধান আসামি করা হবে। তিনি বলেন, “তার সংশ্লিষ্টতা আমরা পেয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ও তদন্তে উঠে এসেছে। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে বাহিনী প্রধান, পুলিশ কমিশনারসহ আরও অনেকে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।

এছাড়া সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপার ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রসিকিউশন পুরো ঘটনাকে ‘সিস্টেম্যাটিক ক্রাইম’ বা পরিকল্পিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছে।

শাপলা চত্বরের ঘটনার পর একাত্তর টেলিভিশনে প্রচারিত ‘সমীকরণ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে সাংবাদিক ফারজানা রুপা কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি ও আওয়ামী লীগ সমর্থক হুজুরবেশী লোকজনের বক্তব্য নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। তার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ ঘটনায় দীপু মনি, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাকে আগামী ১৪ মে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে দিন ও রাতে শুধু শাপলা চত্বর ও ঢাকায় ৩২ জন নিহত হন। তদন্ত সংস্থা তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের ময়নাতদন্ত হয়েছে, আবার অনেকের হয়নি। কবর ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পরদিন ৬ মে নারায়ণগঞ্জে আরও ২০ জন নিহত হন। এছাড়া একই দিনে চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রসিকিউশন সূত্র জানায়, নিহতদের বেশির ভাগই ছিলেন মাদ্রাসাছাত্র। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন হাফেজ মাহমদুল হাসান জুবায়ের (২০), আতাউর রহমান (২৪), ইশা হক আলী (৪৫), আবু বকর সিদ্দিক (২৫), আব্দুল ওয়াহাব মোল্লা (২৫), সিরাজুল ইসলাম (২২), মুক্তার মিয়া (১৫), কাজী মোহাম্মদ রকিবুল হক (৪৩), আল-আমিন (১৮) ও নাজমুল ইসলাম (৩০)।

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ মামলা করা হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চলছে। নতুন চিফ প্রসিকিউটর দায়িত্ব নেওয়ার পর মামলার অগ্রগতি দ্রুত এগোচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক এএসপি এফএম ইফতেখারুল আলম বলেন, তদন্তে শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে এবং তাকেও আসামি করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেওয়া হবে।

মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক আইজিপি কেএম শহীদুল হক, হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজীর আহমেদ, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ আরও অনেকে।

এদিকে, এ মামলায় পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল জলিল মণ্ডল ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ২০২১ সালের ১০ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তারা ৬১ জন নিহতের নাম সংগ্রহ করেছিল। পরে ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের ফেসবুক পেজে নিহতদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়।

/এসএন