রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনেই ঢাকায় অন্তত ১৬টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে, যা নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতির কারণে জনমনে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে রাজধানীতে মোট ১০৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি এবং মার্চে ৩৩টি খুনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে মোট ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে সর্বোচ্চ ৩১৭টি খুনের ঘটনা ঘটে, যা পরিস্থিতির ক্রমাবনতির ইঙ্গিত দেয়।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে সশস্ত্র হামলায় ধর্মসিং চাকমা নিহত হওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একই ঘটনায় আরও দুই নারী গুরুতর আহত হন, যা স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কেউ বিদেশে অবস্থান করে, আবার কেউ দেশে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। বিভিন্ন পেশার মানুষকে ফোনে হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, রাজধানীর বিভিন্ন বাজার, ফুটপাত এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সক্রিয় রয়েছে এসব চক্র। প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে এবং এই অর্থের একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে অপরাধ চক্রগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও কাফরুলসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। এসব দ্বন্দ্ব প্রায়ই সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কাফরুলে একটি গার্মেন্ট কারখানায় ঢুকে অস্ত্রের মুখে চাঁদা দাবি এবং গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনাও সামনে এসেছে, যা পরিস্থিতির অবনতির প্রমাণ দেয়।
বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি জামিনে মুক্ত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুরনো সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের পুনরুত্থান, বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজির বিস্তার—এসব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। অনেক ভুক্তভোগী ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে মুখ খুলতে না পারায় সমস্যা আরও গভীর হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রাজধানীসহ সারা দেশে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।