ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল—দেশজুড়ে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। কোথাও বিক্রেতার হাঁকডাক, কোথাও দর-কষাকষিতে ব্যস্ত ক্রেতারা। দেশি-বিদেশি নানা জাতের গরু নিয়ে এখন সরগরম প্রায় সব হাট।
অনেক পরিবারের কাছে কোরবানির গরু কেনা শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, বরং বছরের অন্যতম আবেগঘন আয়োজন। ফলে বড়, মোটাসোটা ও দেখতে আকর্ষণীয় গরুর প্রতিই অনেকের আগ্রহ বেশি থাকে। তবে পশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে গরু কেনা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত গরু মোটাতাজা করতে স্টেরয়েড, হরমোন ও বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করেন। এতে গরু বাইরে থেকে অস্বাভাবিকভাবে মোটা ও চকচকে দেখালেও ভেতরে ভেতরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের গরুর মাংস মানুষের শরীরের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই গরু কেনার আগে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ওষুধ বা রাসায়নিক প্রয়োগ করা গরু সাধারণত স্বাভাবিক আচরণ করে না। এসব গরু হাঁটতে চায় না, কম নড়াচড়া করে, ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে এবং সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় শরীরের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতাও কমে যায়। অতিরিক্ত ওজনের কারণে তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল হাশেম বলেন, স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ ব্যবহারের ফলে গরুর শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে যায়। এতে গরুকে ভারী ও মোটাসোটা দেখালেও বাস্তবে তার কিডনি, যকৃত, পাকস্থলী ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি জানান, এসব ক্ষতিকর উপাদানের প্রভাব রান্নার পরও পুরোপুরি নষ্ট হয় না।
হাটে গিয়ে গরু কেনার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রথমত, গরুর শরীর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে আছে কি না দেখতে হবে। বিশেষ করে রান, ঘাড় বা পেট বেশি ফোলা দেখালে সতর্ক হতে হবে। শরীরে হাত দিয়ে চাপ দিলে যদি কিছু সময়ের জন্য গর্তের মতো বসে থাকে, তবে বুঝতে হবে শরীরে পানি জমেছে।
দ্বিতীয়ত, গরুর চলাফেরা লক্ষ্য করতে হবে। সুস্থ গরু সাধারণত চটপটে হয়, আশপাশের শব্দে সাড়া দেয়, হাঁটাচলা করে এবং লেজ নাড়ায়। অন্যদিকে অসুস্থ গরু অনেক সময় শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।
পশু বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ গরুর নাকের ওপরের অংশ সাধারণত ভেজা বা ঘামযুক্ত থাকে। অসুস্থ গরুর নাক অনেক সময় শুকনো হয়ে যায়। এছাড়া অতিরিক্ত স্টেরয়েড দেওয়া গরুর মুখ দিয়ে অনবরত লালা ঝরতে পারে।
গরুর শ্বাস-প্রশ্বাসও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। রাসায়নিক ব্যবহার করা গরুর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয় এবং দূর থেকে দেখলেও মনে হতে পারে গরুটি হাঁপাচ্ছে। কারণ ভেতরের অঙ্গগুলো দুর্বল হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, সুস্থ গরুর শরীর উজ্জ্বল ও চামড়া টানটান থাকে। পিঠের কুঁজ শক্ত ও দাগমুক্ত থাকে। অন্যদিকে রাসায়নিক প্রয়োগ করা গরুর পা বা রানের মাংস নরম ও থলথলে হতে পারে।
গরুর শরীর অস্বাভাবিক গরম কি না সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ গরুর দেহের তাপমাত্রা সাধারণত ১০২ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে থাকে। খুরা রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এ ধরনের গরু খুঁড়িয়ে হাঁটে, মুখ বা ক্ষুরে ঘা থাকে, খাবারে অনীহা দেখা দেয়।
কৃমিতে আক্রান্ত গরু সাধারণত বিবর্ণ ও হাড়জিরজিরে হয়। এছাড়া মুখ, জিহ্বা, পা, ক্ষুর বা গোড়ালিতে ক্ষত থাকলেও সতর্ক হতে হবে। খাবারের প্রতি অনীহা, জাবর না কাটা কিংবা মুখ শুকনো থাকাও অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে।
শুধু সুস্থ হলেই হবে না, গরুটি শরিয়ত অনুযায়ী কোরবানির উপযুক্ত কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গরুর বয়স কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে। নিচের পাটিতে সামনের দিকে দুটি স্থায়ী দাঁত উঠলে সাধারণত গরুটিকে কোরবানির উপযুক্ত ধরা হয়। এছাড়া শরীরে বড় ধরনের ত্রুটি থাকা যাবে না।
বিশেষজ্ঞরা গর্ভবতী গাভি কোরবানি না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। গর্ভবতী গাভির পেট ও ওলান সাধারণত স্ফীত থাকে। সন্দেহ হলে অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেছেন তারা।
গরু কেনার জন্য দিনের বেলাকে সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ ক্রেতারা। কারণ রাতের বেলায় গরুর চোখ-মুখ, শরীরের দাগ বা ক্ষত ভালোভাবে বোঝা যায় না। পাশাপাশি চলাফেরা ও আচরণও ঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরবানির গরু কেনা শুধু বড় বা দামি পশু কেনার প্রতিযোগিতা নয়। এটি একটি ইবাদত। তাই চকচকে শরীর বা অস্বাভাবিক মোটা গরু দেখে আকৃষ্ট না হয়ে ধৈর্যের সঙ্গে পশুর আচরণ, শ্বাস-প্রশ্বাস, দাঁত, নাক, পা ও শরীরের স্বাভাবিক অবস্থা যাচাই করা উচিত। সামান্য সচেতনতাই পরিবারকে ঝুঁকিপূর্ণ মাংস থেকে দূরে রাখতে পারে এবং কোরবানির আনন্দকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে সহায়তা করতে পারে।