• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৮ এএম


৮২ বছরেও নিজ হাতে রসগোল্লা বানান উষা রঞ্জন, প্রতিটি বিক্রি হয় ১২ টাকায়

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৮ জুলাই ২০২৬ ১১:০৩ এএম

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং বাজারে ‘পাল মিষ্টি ভান্ডার’ নামটি যেন একটি ঐতিহ্যের প্রতীক। ৮২ বছর বয়সী উষা রঞ্জন পাল গত পাঁচ দশক ধরে এখানেই তৈরি করে আসছেন তাঁর বিখ্যাত রসগোল্লা। এই দোকানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—রসগোল্লা কেজি দরে নয়, বিক্রি হয় পিস হিসেবে। এখনো কাঠের চুলায় পুরোনো পদ্ধতিতে তৈরি হয় প্রতিটি মিষ্টি, আর সেই কারণেই স্বাদে কোনো পরিবর্তন আসতে দেননি তিনি।

হারবাং বাজারের পুরোনো টিনশেডের দোকানটির ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে নড়বড়ে কাঠের টেবিল-চেয়ার। এক পাশে বড় কড়াইয়ে কড়া পাকে জাল দেওয়া গরম রসগোল্লা, যা প্লেটে করে একের পর এক পৌঁছে যাচ্ছে ক্রেতাদের টেবিলে। চারদিকে ছড়িয়ে থাকে ঘন দুধ, মালাই ও এলাচের মৃদু সুবাস।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হারবাং বাসস্টেশন থেকে পশ্চিমে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হারবাং বাজারের পুরোনো দোকানগুলোর মাঝেই রয়েছে ‘পাল মিষ্টি ভান্ডার’। এলাকাজুড়ে এটি ‘পালের মিষ্টি’ নামেই পরিচিত। এখানে শুধু দুটি পণ্যই বিক্রি হয়—রসগোল্লা ও মুচমুচে নিমকি। রসগোল্লার দাম প্রতি পিস ১২ টাকা। পাঁচ দশক ধরে একই নিয়মে বিক্রি হচ্ছে এই মিষ্টি। প্রতিদিনই ক্রেতাদের লাইন পড়ে যায়, আর দেরি করে গেলে অনেক সময় রসগোল্লা পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।

সোমবার দোকানটিতে গেলে দেখা যায়, সামনের অংশে চলছে জমজমাট বিক্রি, আর ভেতরের কারখানায় চুলার পাশে বসে নিজ হাতে রসগোল্লা তৈরিতে ব্যস্ত উষা রঞ্জন পাল। এক পাশে বড় টিনের ড্রামে রাখা নিমকি, অন্য পাশে টিনের গামলায় সাজানো ছোট ছোট রসগোল্লা। বাহারি সাজ বা চাকচিক্য নেই, তবে শুরু থেকেই যে সরলতা ছিল, আজও সেটিই ধরে রেখেছেন তিনি। এখনো মাটির চুলায় কাঠের আগুনে রসগোল্লা তৈরি হয়।

গল্পের শুরুটা ছিল সংগ্রামের

খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারান উষা রঞ্জন পাল। পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে বই-খাতা ছেড়ে খুব অল্প বয়সেই কাজে নামতে হয় তাঁকে। ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে হারবাং বাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘দত্ত মিষ্টি ভান্ডারে’ কাজ শুরু করেন তিনি।

উষা রঞ্জন বলেন, সংসার চালানোর তাগিদেই কাজে নামতে হয়েছিল। শুরুতে তিনি শুধু রসগোল্লা তৈরি দেখতে থাকেন। পরে ধীরে ধীরে হাতে-কলমে শেখেন কীভাবে দুধ জ্বাল দিতে হয়, কখন ছানা কাটতে হয়, কতক্ষণ মাখতে হয় এবং কতটা আগুনে রস ফুটাতে হয়। সেই দোকানই একসময় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষালয়ে পরিণত হয়।

কর্মচারী থেকে দোকানের মালিক

১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দত্ত মিষ্টি ভান্ডারের মালিক রেবতী দত্ত দোকানটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। অনেকের কাছে এটি ছিল একটি ব্যবসা, কিন্তু উষা রঞ্জনের কাছে ছিল জীবনের বড় সুযোগ। নিজের সঞ্চয় আর সাহসকে পুঁজি করে তিনি দোকানটি কিনে নেন এবং নতুন নাম দেন ‘পাল মিষ্টি ভান্ডার’।

স্মৃতিচারণ করে উষা রঞ্জন বলেন, “তখন মানুষ এক আনায় রসগোল্লা কিনে খুশি হতো। এখন একটি মিষ্টি ১২ টাকা। সময় বদলেছে, দাম বদলেছে, কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি স্বাদটা যেন না বদলায়।” তাঁর বিশ্বাস, স্বাদের এই ধারাবাহিকতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

স্বাদের টানে দূরদূরান্তের ক্রেতা

চকরিয়া, পেকুয়া, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও লামাসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে মানুষ এই দোকানে আসেন। কেউ আত্মীয়ের বাড়ি, কেউ মেয়ের শ্বশুরবাড়ি, আবার কেউ দূর শহরে ফেরার পথে সঙ্গে করে নিয়ে যান ‘পালের মিষ্টি’। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি মিষ্টি নয়, বরং ভালোবাসা বহন করার একটি উপহার।

বিশেষ করে বিকেলের দিকে মোটরসাইকেলে করে অনেক তরুণের ভিড় জমে দোকানটিতে। পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মী রাশেদুল কবির নিয়মিত এখানকার ক্রেতা। তিনি বলেন, মাসে চার থেকে পাঁচবার এই দোকানে রসগোল্লা খেতে আসেন। বাড়ির জন্যও নিয়ে যান। তাঁর ভাষায়, স্বাদ ও গুণে এই মিষ্টি অনন্য।

পুরোনো পদ্ধতিতেই তৈরি

উষা রঞ্জনের রসগোল্লা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় মাত্র চারটি উপাদান—ছানা, চিনি, এলাচ ও অল্প পরিমাণ ময়দা। এক কেজি ছানার সঙ্গে মাত্র ২০ গ্রাম ময়দা মেশান তিনি। তাঁর বিশ্বাস, এর বেশি ময়দা দিলে মিষ্টির গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়।

দুধের ছানা কাটা হয় লেবুর রস দিয়ে। এরপর মাটির চুলায় কাঠের আগুনে ধীরে ধীরে তৈরি করা হয় রসগোল্লা। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়লেও তিনি এখনো পুরোনো পদ্ধতিই অনুসরণ করেন। তাঁর ভাষায়, কাঠের আগুনের আলাদা একটি জ্বাল রয়েছে, যা মিষ্টির স্বাদকেও আলাদা করে তোলে।

ভালোবাসাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি

উষা রঞ্জন জানান, ৪০ কেজি দুধ থেকে মাত্র ৩০০টি রসগোল্লা তৈরি হয়। তিনি সব সময় সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে বেশি গুরুত্ব দেন। দুধের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কেজি মিষ্টি তৈরি হয়। তবে বিয়ে, মিলাদ বা বড় অনুষ্ঠানের অর্ডার থাকলে উৎপাদন বাড়ানো হয়।

দৈনিক আয়ের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, “৫০ বছরের ব্যবসা। কত উত্থান-পতন ঘটেছে। ব্যবসা ছেড়ে যাইনি। এখানে ভালোবাসা আমার কাছে মুখ্য। আয় যা হয়, তা দিয়েই সংসার চলে।”

বর্তমানে দোকানে তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন কর্মচারী কাজ করেন। তবু দিনের একটি সময় তিনি নিজেই দোকানে থাকেন। কখনো ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেন, কখনো কড়াইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছানা দেখেন, আবার কখনো নতুন তৈরি হওয়া মিষ্টির রং দেখে জ্বাল ঠিক হয়েছে কি না তা যাচাই করেন।

তাঁর তিন সন্তানের মধ্যে দুই ছেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং মেয়ে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সন্তানরা নিজ নিজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলেও উষা রঞ্জন পাল এখনো দোকান ছেড়ে বাড়িতে বসে থাকতে পারেন না। তাঁর কাছে এই দোকান শুধু জীবিকার উৎস নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।