• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম


প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ কি না জানুন

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৭ মে ২০২৬ ৪:৫০ পিএম

বিয়ে ইসলামে শুধু সামাজিক সম্পর্ক নয়, এটি একটি পবিত্র ইবাদত ও গুরুত্বপূর্ণ আমানত হিসেবেও বিবেচিত। বর্তমান সময়ে দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে সমাজে নানা আলোচনা, বিতর্ক ও বিভ্রান্তি রয়েছে। বিশেষ করে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা বৈধ কি না—এই প্রশ্নটি অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। ইসলামি শরিয়ত এ বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ইসলামে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে একজন পুরুষকে সর্বোচ্চ চারটি বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—

“তোমাদের কাছে নারীদের মধ্যে যারা ভালো লাগে, তাদের মধ্য থেকে দুই, তিন অথবা চারজনকে বিয়ে করো। কিন্তু যদি আশঙ্কা কর যে, ন্যায়বিচার করতে পারবে না—তবে একজনই যথেষ্ট।” (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, একাধিক বিয়ে ইসলামে কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয়; বরং এটি একটি অনুমতি, যা কঠোর ন্যায়বিচারের শর্তের সঙ্গে যুক্ত।

দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ফরজ কি না—এ বিষয়ে শরিয়তের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বিয়ের মৌলিক শর্ত যেমন সাক্ষী, ইজাব-কবুল ও মোহরানা পূরণ হলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হবে।

তবে ইসলাম কেবল বিয়ের বৈধতা নয়, এর সঙ্গে জড়িত দায়িত্ব ও ন্যায়পরায়ণতার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে। একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শর্ত হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। শুধু ভরণপোষণ নয়, সময়, দায়িত্ব, আচরণ ও মর্যাদার ক্ষেত্রেও সমতা বজায় রাখতে হবে।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে আরও বলেছেন—

“তোমরা নারীদের মধ্যে পুরোপুরি ন্যায়বিচার করতে কখনোই সক্ষম হবে না, যদিও তোমরা চেষ্টা কর।” (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১২৯)

এই আয়াত মানুষকে সতর্ক করে দেয় যে, একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার করা অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব। তাই যার সেই সক্ষমতা নেই, তার জন্য একাধিক বিয়ের পথে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

রাজধানীর আফতাবনগরের আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া ইদারাতুল উলূম মাদরাসা–এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল মুফতি মোহাম্মদ আলী বলেন, শরয়ি কারণ থাকলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াও দ্বিতীয় বিয়ে করা যেতে পারে। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, প্রথম স্ত্রী অবাধ্য হলে, শারীরিক সম্পর্ক করতে অক্ষম হলে, গুরুতর অসুস্থ থাকলে বা এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে যেখানে স্বামীর গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তখন একজন আলেমের পরামর্শ নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, প্রথম স্ত্রীর কোনো সমস্যা বা শরয়ি ওজর না থাকলে একাধিক বিয়ের প্রয়োজনীয়তা থাকে না। কারণ তখন সংসারে অশান্তি ও বৈষম্যের আশঙ্কা তৈরি হয়, যা ইসলামের উদ্দেশ্য নয়।

তার মতে, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে হয়ে গেলেও ইসলাম একাধিক বিয়ের অনুমতি তখনই দিয়েছে, যখন উভয় স্ত্রীর হক সমানভাবে আদায় করা সম্ভব হবে। সাম্য বজায় রাখতে না পারলে দ্বিতীয় বিয়ে জায়েজ নয়।

ইসলামে স্ত্রীকে সম্মান ও ভালো রাখার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন—

“নারীদের সঙ্গে সদাচরণের উপদেশ গ্রহণ কর।” (বুখারি, হাদিস ৫১৮৬)

আরেক হাদিসে এসেছে—

“মুমিনদের মধ্যে পূর্ণতর মুমিন সেই ব্যক্তি, যার আচার-আচরণ উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।” (ইবনে হিব্বান, হাদিস ৪১৭৬)

হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন—

“মুমিনদের মাঝে সেই ব্যক্তি অধিকতর পূর্ণ মুমিন, যে সদাচারী এবং পরিবারের প্রতি কোমল ও অনুগ্রহশীল।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৪২০৪; তিরমিজি, হাদিস ২৬১২)

ইসলামি আলোচনায় বলা হয়েছে, গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে তখনই অবৈধ হবে, যদি বিয়ের মৌলিক শর্ত পূরণ না হয় অথবা প্রথম স্ত্রীর অধিকার নষ্ট হয়। তবে বাস্তবতায় গোপন বিয়ে অনেক সময় পারিবারিক ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা ইসলাম সমর্থন করে না।

ইসলাম শুধু আইনি বৈধতার শিক্ষা দেয় না; বরং দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও তাকওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেয়। তাই দ্বিতীয় বিয়ে করার আগে একজন মুসলিমের উচিত নিজের সক্ষমতা যাচাই করা, আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয় স্মরণ রাখা এবং প্রথম স্ত্রীর অনুভূতি ও অধিকারকে সম্মান করা।

কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু বিয়ের বৈধতাই নয়, বরং ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব পালনের হিসাবও আল্লাহর কাছে দিতে হবে।

/এসএন