• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৩ এএম


মমতার সহযোগী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী—শুভেন্দুর রাজনৈতিক পথচলা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৬ মে ২০২৬ ১:০২ পিএম

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০১১ সালের ‘পরিবর্তন’-এর রাজনীতিতে, বিশেষ করে নন্দীগ্রাম আন্দোলনে তার নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-তে যোগ দেওয়ার পর তিনি রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে তার রাজনৈতিক কৌশল ও সক্রিয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরির পেছনে ছিল সংগঠনগত দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে অসন্তোষ। বিশেষ করে দলীয় কাঠামোয় নতুন প্রজন্মের উত্থান এই দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে ওঠে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে, যার নেতৃত্বে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাকে এই আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও এই কৃতিত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও নন্দীগ্রামের মানুষ তার ভূমিকা ভোলেননি। প্রায় পনেরো বছর পর রাজ্যে আবারও পালাবদলের প্রেক্ষাপটে শুভেন্দু অধিকারী নতুন করে আলোচনায় আসেন এবং বিরোধী রাজনীতির সেনাপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

গণমাধ্যমে আগে থেকেই জানা গিয়েছিল যে, তিনি ভবানীপুর বিধানসভা আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী হতে পারেন। দলীয় প্রার্থী নির্ধারণের সময় অমিত শাহ তার কাছে জানতে চান, ওই আসনে কাকে প্রার্থী করা যেতে পারে। জবাবে শুভেন্দু বলেন, অনুমতি পেলে তিনি নিজেই প্রার্থী হতে চান এবং জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেন।

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে শুধু অমিত শাহ বা নিতিন নবীনের মতামত যথেষ্ট ছিল না; বিষয়টি নিয়ে নরেন্দ্র মোদি-র অনুমতিও নেওয়া হয়। পরবর্তী দেড় মাসে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। পরিকল্পিতভাবে প্রচার চালিয়ে ভবানীপুরের ভোটারদের সমর্থন অর্জন করেন শুভেন্দু এবং বিপুল ব্যবধানে জয় লাভ করেন।

তবে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা আরও আগে থেকেই। ২০১১ সালের পরবর্তী সময়ে শুভেন্দু তৃণমূলের যুব সভাপতি ছিলেন এবং মুকুল রায় দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মুকুল রায়ের পরামর্শে ‘তৃণমূল যুবা’ নামে নতুন সংগঠন গঠন করে তার দায়িত্ব অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে শুভেন্দুকে যুব সভাপতির পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়, যা তার সঙ্গে দলের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

নন্দীগ্রাম, লালগড় ও জঙ্গলমহলে জীবন ঝুঁকি নিয়ে সংগঠন গড়ে তোলার পরও দলের ভেতরে নিজের অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয় তার মধ্যে। তিনি মনে করতে থাকেন, পরিবারভিত্তিক রাজনীতিতে রক্তের সম্পর্কই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই ভাবনাকে আরও দৃঢ় করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায়। অধিকারী পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং এক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তিনি মেদিনীপুরেও গিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি শুভেন্দুকে জানান, ওই দলে তার ভবিষ্যৎ নেই।

ধীরে ধীরে তৃণমূলের ভেতরে নিজের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে শুভেন্দুর। তবে ব্যক্তিগতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তার শ্রদ্ধা বজায় ছিল। কোভিড মহামারির সময় মমতার জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়েও তিনি সতর্কতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোরের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও প্রভাবিত করে। তিনি কালীঘাটকে বোঝান যে শুভেন্দু বড় কোনো নেতা নন এবং সব কৃতিত্ব মমতারই। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের নভেম্বরে শুভেন্দু অধিকারীর তৃণমূল ত্যাগ করা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। দল ছাড়ার পর তার বিরুদ্ধে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তিনি প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়েছিলেন। বিজেপির পক্ষ থেকে তাকে আইনি সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।

২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন শুভেন্দু অধিকারী, যা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনে সাহস, দৃঢ়তা ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন এবং রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন।

/এসএন