• ঢাকা
  • বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫১ পিএম


পারমাণবিক হামলার আশঙ্কায় ইরানে জরুরি সতর্কতা, নাগরিকদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৪ নভেম্বর ২০২৬ ১০:২৯ পিএম

পারমাণবিক হামলার আশঙ্কায় ইরানে জরুরি সতর্কতা, নাগরিকদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা

পারমাণবিক হামলা কিংবা তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় নাগরিকদের জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করেছে ইরান। সম্ভাব্য পারমাণবিক বিস্ফোরণ ও তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষায় কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

নাগরিকদের নিরাপদ ভবনে আশ্রয় নেওয়া, দরজা-জানালা বন্ধ রাখা, দূষিত পোশাক খুলে ফেলা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়োডিন ট্যাবলেট সেবন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার রাতে হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর এ নির্দেশনা সামনে আসে। এর আগে ইরানের মাউন্ট কোলাংসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এমনকি ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন বলেও মার্কিন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানে হামলার কথা স্বীকার করেন ট্রাম্প।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে কোনো পক্ষই লাভবান হবে না।

সরকারি এক সভায় তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ থেকে কেউ লাভবান হবে না।’ তাঁর ভাষ্য, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবারও ইরানের মাউন্ট কোলাংয়ে হামলার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন।

জায়গাটির সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সোমবার তিনি এ ধরনের হামলাকে বড় কোনো বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন। এমনকি অভিযানটি এক ঘণ্টার মধ্যেই চালানো সম্ভব বলেও দাবি করেন।

এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন বলে মার্কিন গণমাধ্যমে আলোচনা চলছে। মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক টাকার কার্লসন দাবি করেছেন, নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে ট্রাম্পকে উসকানি দিচ্ছেন। এ ধরনের হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে মাউন্ট কোলাং। একসময় কার্লসন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

পারমাণবিক হামলা হলে কী করবেন?

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি (আইআরএনএ) পারমাণবিক হামলা বা তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকদের করণীয় নিয়ে একটি নির্দেশনামূলক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে।

ইসফাহান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উপপরিচালক ইব্রাহিম আদেলজাদেহ ওই সাক্ষাৎকারে সম্ভাব্য পারমাণবিক দুর্ঘটনা মোকাবিলায় বেশ কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবার আগে সরকারি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী, ভবনের ভেতরে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হলে দরজা-জানালা ভালোভাবে বন্ধ রাখতে হবে। বাইরে থেকে বাতাস প্রবেশ করে এমন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থাও বন্ধ করে দিতে হবে।

আশ্রয়ের জন্য ভবনের বেসমেন্ট অথবা জানালাবিহীন মাঝের দিকের কোনো ঘর সবচেয়ে উপযুক্ত হতে পারে। বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটলে সরাসরি বিস্ফোরণের দিকে তাকানো যাবে না। প্রাথমিক বিস্ফোরণের ধাক্কা কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সম্ভব হলে কোনো শক্ত প্রতিবন্ধকের আড়ালে মাটির কাছাকাছি অবস্থান করতে হবে।

আদেলজাদেহ বলেন, তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়লে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেগুলোকে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে না দেওয়া। এ জন্য আশ্রয়স্থল যতটা সম্ভব বায়ুরোধী রাখতে হবে।

তেজস্ক্রিয় কণার সংস্পর্শে এসেছেন বলে আশঙ্কা হলে হাত দিয়ে মুখ, চোখ বা নাক স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সতর্কতার সঙ্গে বাইরের পোশাক খুলে একটি মুখবন্ধ ব্যাগে রাখতে হবে। দূষিত পোশাক যেন অন্য মানুষের সংস্পর্শে না আসে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

তাঁর মতে, হালকা গরম পানি ও সাবান দিয়ে ত্বক এবং চুল ধুয়ে ফেললে শরীর থেকে তেজস্ক্রিয় কণা দূর করতে সহায়তা করে। তবে এ ধরনের পরিস্থিতিতে সম্ভব হলে ভবনের ভেতরেই অবস্থান করা উচিত। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া উচিত নয়। অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে ত্রাণ ও জরুরি সেবা সংস্থার নির্ধারিত পথ অনুসরণ করতে হবে।

তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাতাসের মাধ্যমে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিস্ফোরণস্থল থেকে দূরে বসবাসকারীদেরও সরকারি সতর্কবার্তা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

গাড়িতে করে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার প্রয়োজন হলে জানালা ও বাইরের বাতাস প্রবেশের ভেন্ট বন্ধ রাখতে হবে। সম্ভব হলে গাড়ির অভ্যন্তরীণ বায়ু সঞ্চালন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, যাতে বাইরের দূষিত বাতাস ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।

ধুলাবালি উড়তে থাকলে মুখ ও নাক কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। এতে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয় কণা শরীরে প্রবেশের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।

আয়োডিন ট্যাবলেট কি তেজস্ক্রিয়তা থেকে রক্ষা করে?

পারমাণবিক জরুরি পরিস্থিতিতে কোন ওষুধ ব্যবহার করা যাবে, সে বিষয়েও সতর্ক করেছে ইরানের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইসফাহান প্রাক-হাসপাতাল জরুরি বিভাগের জনসংযোগ বিভাগ এ বিষয়ে একটি শিক্ষামূলক ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব মোকাবিলায় করণীয় তুলে ধরা হয়েছে।

বিভাগটির কর্মকর্তা আব্বাস আবিদি বলেছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ, বিশেষ করে আয়োডিন ট্যাবলেট সেবন করা উচিত নয়। নিরাপদ ভবনে আশ্রয় নেওয়া, তেজস্ক্রিয় কণার সংস্পর্শে এলে দ্রুত দূষণমুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলাই সবচেয়ে জরুরি।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, তেজস্ক্রিয় আয়োডিন থাইরয়েড গ্রন্থিতে জমা হওয়ার ঝুঁকি থাকলে পটাশিয়াম আয়োডাইড ট্যাবলেট তা প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। তবে এটি সব ধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থ বা বিকিরণ থেকে সুরক্ষা দেয় না।

আবিদি বলেন, এ ওষুধ কেবল স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সুপারিশ অনুযায়ী সেবন করা উচিত। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং তেজস্ক্রিয়তার ধরন বিবেচনা করেই এর ব্যবহার নির্ধারণ করতে হবে। আগাম সতর্কতা হিসেবে কিংবা পারমাণবিক দুর্ঘটনার আশঙ্কায় নিজে নিজে আয়োডিন ট্যাবলেট খাওয়া উচিত নয়।

তেজস্ক্রিয় সিসিয়ামের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে প্রুশিয়ান ব্লু

ইসফাহান প্রাক-হাসপাতাল জরুরি বিভাগের প্রকাশিত ভিডিওতে ‘প্রুশিয়ান ব্লু’ নামের আরেকটি ওষুধের ব্যবহার নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।

আবিদি জানান, তেজস্ক্রিয় সিসিয়াম শরীরে প্রবেশ করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রুশিয়ান ব্লু ওষুধ চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতে পারে। এটি শরীর থেকে তেজস্ক্রিয় সিসিয়াম বের করে দিতে সহায়তা করে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রুশিয়ান ব্লু আয়োডিন ট্যাবলেটের বিকল্প নয়। কারণ, দুটি ওষুধ ভিন্ন ধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে।

/এএসএফ