• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫২ পিএম


ইমরান মুক্তি পেলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘা’তে যাবেন না, ইমরান-সেনাবাহিনী সম্পর্কের বরফ গলছে?

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২১ আগস্ট ২০২৬ ২:৫৫ পিএম

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দেশটির সামরিক বাহিনী বা সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে নতুন করে কোনো বিরোধে জড়াবেন না বলে দাবি করেছেন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি। তার এই বক্তব্যকে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইমরানের দলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালো ইঙ্গিতগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বুধবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুখারি বলেন, ইমরান খান মুক্তি পাওয়ার পর দেশের ক্ষতি হয়—এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। দেশের স্বার্থকে সামনে রেখে নিজের কষ্ট ও ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন তিনি।

বুখারি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে, আপনি সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাতে যাবেন। নিজের কষ্ট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, নিজের যন্ত্রণা দমন করতে হবে এবং দেশের কল্যাণের জন্য তা মেনে নিতে হবে।’

এমন বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান ও সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কমানোর সম্ভাব্য একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

ইমরান খান ও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই তিক্ত। ২০২২ সালে সংসদে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইমরানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়। ২০২৩ সালে তাকে গ্রেফতার করা হলে তার সমর্থকেরা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন।

ইমরানের সমর্থকদের বড় একটি অংশের ধারণা, সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের কারণেই তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। অতীতেও ইমরান মুনিরকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। গত নভেম্বরে তার নামে প্রচারিত এক বক্তব্যে তিনি মুনিরকে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘স্বৈরাচারী একনায়ক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। একই সঙ্গে নিজের ও স্ত্রী বুশরা বিবির ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানোর অভিযোগও করেছিলেন তিনি।

সেসময় ইমরান বলেছিলেন, তার সঙ্গে যা-ই করা হোক না কেন, তিনি সামরিক নেতৃত্বের কাছে মাথা নত করবেন না।

তবে এবার তার দলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বক্তব্যে ভিন্ন সুর পাওয়া যাচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি সেনাবাহিনী ও ইমরানের দলের মধ্যে কোনো সমঝোতার পথ তৈরি হয়েছে?

বুখারি আসিম মুনিরকে পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, সেনাপ্রধান চাইলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, পিটিআই ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি এবং কোনো আলোচনাও চলছে না।

বুখারির বক্তব্য নিয়ে পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দেশটির সামরিক বাহিনী এর আগেও বলে আসছে, তারা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। অন্যদিকে সরকারও বলে আসছে, ইমরানের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো আদালতের বিষয়।

সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে নতুন আশা

গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ৭৩ বছর বয়সি ইমরান খানকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কারাগার থেকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। তার চিকিৎসার জন্যই আদালত এই নির্দেশনা দেন।

পিটিআইয়ের মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি আদালতের সিদ্ধান্তকে ‘নতুন আশার আলো’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালের বাইরে দলের নেতাকর্মীদের জমায়েত না করার সিদ্ধান্ত মেনে চলবে পিটিআই। বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাতে ইমরানকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

ইমরানকে হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তকে সামরিক বাহিনী ও পিটিআইয়ের মধ্যকার উত্তেজনা কমানোর সম্ভাব্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন কিছু বিশ্লেষক। তবে এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে।

ইমরানের অবস্থান কতটা বদলেছে, তা স্পষ্ট নয়

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, পিটিআইয়ের বর্তমান নেতৃত্বের বক্তব্য এবং ইমরান খানের ব্যক্তিগত অবস্থান একই নাও হতে পারে।

দলের অনেক শীর্ষ নেতা গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন। আবার অনেকে কারাগারে আছেন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের অভিযানের কারণে পিটিআইয়ের সাংগঠনিক কাঠামোর বড় অংশও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘ইমরান কারাগারে থাকা অবস্থায় সম্ভাব্য কোনো আলোচনা বা সমঝোতায় পিটিআইয়ের নেতৃত্ব কতটা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে পারবে, তা পরিষ্কার নয়।’

এদিকে বুখারি নিজেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন। তার দাবি, পিটিআইয়ের শীর্ষ নেতারা প্রায় আট মাস ধরে ইমরানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেননি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ইমরানকে দীর্ঘ সময় ধরে অনেকটা একাকী অবস্থায় রাখা হয়েছে। ফলে তার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি কোনো বক্তব্যও পাওয়া যাচ্ছে না।

সেপ্টেম্বরে আবারও আন্দোলনে পিটিআই

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আপাতত সংঘাত কমানোর ইঙ্গিত দিলেও আন্দোলনের কর্মসূচি থেকে সরে আসছে না পিটিআই। বুখারি জানিয়েছেন, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী পদযাত্রার কর্মসূচি পালন করবে দলটি।

ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়া হোক বা না হোক, এই কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছেন তিনি। কর্মসূচিতে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ইমরানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, তার পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, আইনজীবী ও দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া এবং তার মামলাগুলোর দ্রুত শুনানির দাবি জানানো হবে।

এর পাশাপাশি ইমরানের মুক্তির দাবিও জানানো হবে।

বুখারি বলেন, আত্মগোপনে থাকা পিটিআইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতারাও এই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন অথবা তা সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখবেন। তার ভাষ্য, সামনে হয়তো দলের অনেক নেতাকে আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যাবে। এমনকি তারা প্রকাশ্যে না এলেও আন্দোলন সংগঠনে সক্রিয় থাকবেন।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে সংসদীয় অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হন ইমরান খান। এরপর তার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা করা হয়। তিনি ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। বর্তমানে ১৯ কোটি পাউন্ডের দুর্নীতির মামলায় ১৪ বছরের সাজা ভোগ করছেন ইমরান খান। একই মামলায় তার স্ত্রী বুশরা বিবিও সাত বছরের সাজা পেয়েছেন। এসব মামলায় তার প্রায় সব সাজাই স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। তবে কয়েকটি বিষয়ে আপিল এখনো চলমান।

/এসএন