• ঢাকা
  • শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম


পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখলেই দায় এড়িয়ে বেঁকে বসা ট্রাম্পের পুরানো অভ্যাস

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৬ আগস্ট ২০২৬ ৭:৫৪ পিএম

মার্কিন প্রেসিডেন্সির ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত বাণী হলো ‘দ্য বাক স্টপস হিয়ার’, অর্থাৎ ‘পূর্ণ দায়ভার নিলাম’। কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে কথাটি প্রায় কখনোই খাটে না।

দুর্বল অর্থনীতি এবং এখনো চড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের প্রসঙ্গে ট্রাম্পের দাবি, পূর্বসূরি জো বাইডেন তাকে এই বোঝা দিয়ে গেছেন। অথচ ডেমোক্র্যাট নেতা জো বাইডেন ক্ষমতা ছেড়েছেন ১৮ মাসেরও বেশি সময় আগে। এ ছাড়া ট্রাম্প নিজেই একসময় ক্ষমতা হাতে পেলেই অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

লিংকন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুলের সমস্যাগ্রস্ত সংস্কারকাজের প্রসঙ্গেও রিপাবলিকান ট্রাম্পের জোর দাবি, এটি নাশকতার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও তারই নিয়োগ দেওয়া এক প্রসিকিউটরের দপ্তর জানিয়েছে, নিম্নমানের কাজই এ ক্ষতির কারণ।

ইরান যুদ্ধের ফলে তেলের দাম বেড়েছে। এর জেরে কমেছে ট্রাম্পের জনসমর্থন এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও তীব্র ধাক্কা এসেছে। এ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের দাবি, এসব মূলত তার পূর্ববর্তী ‘ভীরু’ প্রেসিডেন্টদের ভুলের মাশুল। তাদের কারণেই তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঠেকানোর প্রায় ৫০ বছরের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

চটুল ও চটকদার স্লোগানগুলোকে সরিয়ে রাখলে দেখা যায়, আধুনিক যুগের সব প্রেসিডেন্টই কোনো না কোনো মাত্রায় দায়ভার অন্যদের কাঁধে চাপান। তারা প্রায়ই পূর্বসূরি কমান্ডার-ইন-চিফ, কংগ্রেস অথবা উভয়কেই দোষারোপ করেন। তবে ট্রাম্প এই প্রবণতাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। বাস্তবে তিনি এমন এক রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছেন, যার মাধ্যমে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণে তিনি থাকবেন, কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হলে কোনো কিছুর দায় তিনি নেবেন না।

ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক নিকোল অ্যানস্লোভার বলেন, ‘যে প্রেসিডেন্সিয়াল নেতৃত্ব বা যেকোনো ধরনের নেতৃত্বের একটি মূল বৈশিষ্ট্য হলো দায় স্বীকার করা।’

ট্রাম্পের অন্যদের দিকে আঙুল তোলার এই প্রবণতাটি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ক্রমাগত আলোচনায় আসছে। ভুল স্বীকার করতে এই অনীহা অনেক সময় তাকে সমস্যাগুলোর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করার দিকে ঠেলে দেয়। এটি কঠিন লড়াইয়ে থাকা রিপাবলিকান নেতাদের এমন এক পরিস্থিতির মুখে ফেলছে, যেখানে ভোটারদের উদ্বেগ নিরসনে তাদের আশ্বস্ত করার পথ কঠিন হয়ে পড়ছে।

হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলা হচ্ছে, ট্রাম্প কেবল হাত গুটিয়ে বসে সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করছেন না, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করতে কাজ করছেন।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যথাযথভাবেই তার পূর্বসূরিদের ব্যর্থতাগুলোকে মোকাবিলা করছেন এবং একইসঙ্গে আমেরিকান জনগণের জন্য বড় সাফল্য এনে দিতে পদক্ষেপ নিচ্ছেন।’

তিনি এমন কিছু নীতির কথা উল্লেখ করেন, যা তার মতে রিপাবলিকানদের নির্বাচনি প্রচারণায় তুলে ধরার মতো। এর মধ্যে রয়েছে কর ছাড়, প্রেসক্রিপশনের ওষুধের দাম কমানোর উদ্যোগ, অভিবাসন ও মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্তে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজার শক্তিশালী করা।

**দায় এড়ানোর প্রবণতা প্রথম মেয়াদ থেকেই**

ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট থাকার সময় নিজের ডেস্কে ‘দ্য বাক স্টপস হিয়ার’ লেখা একটি ফলক রাখতেন। কথাটি এসেছে ‘পাস দ্য বাক’ অর্থাৎ অন্যের ওপর দায় চাপানোর প্রবাদ থেকে।

১৯৫৩ সালে বিদায়ী ভাষণে ট্রুম্যান বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যিনিই হবেন, সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে। তিনি অন্যদের ওপর দায় চাপিয়ে পার পেতে পারেন না। অন্য কেউ তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এটিই তার কাজ।’

বছরের পর বছর ধরে ব্যবহৃত এ প্রবাদের অর্থ আরও বিস্তৃত হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প নিজেও একসময় একই ধরনের বিশ্বাস পোষণ করতেন। ২০১৩ সালে ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘যা-ই ঘটুক না কেন, দায়িত্ব আপনার নিজের।’

২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতার জন্য মনোনীত হওয়ার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ব্যবস্থাটিকে আমার চেয়ে ভালো আর কেউ বোঝে না, তাই আমিই এটি ঠিক করতে পারব।’ কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি প্রায়ই ইঙ্গিত দিয়েছেন, সমাধান ও দোষ—উভয়ই অন্য কারও।

২০১৯ সালে সরকারের দীর্ঘ শাটডাউনের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘দায়ভার সবার ওপরই বর্তায়।’ আবার ২০২০ সালে, যেদিন তিনি করোনা মহামারি মোকাবিলায় জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করেন, সেদিন কোভিড পরীক্ষার ঘাটতির প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি এর কোনো দায় নেব না।’

অ্যানস্লোভার বলেন, জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলার সম্পূর্ণ দায় নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন ট্রুম্যান। যদিও তার পূর্বসূরি ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যে এমন একটি অস্ত্র তৈরি করছিল, সে সম্পর্কে ট্রুম্যানকে কিছুই জানানো হয়নি।

কিউবায় ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ আক্রমণের দায় নিজের ওপর নেওয়ার পর জন এফ. কেনেডির জনপ্রিয়তা বেড়েছিল। রোনাল্ড রিগ্যান ইরান-কনট্রা কেলেঙ্কারিতে নিজের প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা ছিল কি না সে সম্পর্কে নিশ্চিত নন দাবি করেও এতে জড়ানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘চূড়ান্ত দায়ভার আমার ওপরই বর্তায়।’

২০০৯ সালের শুরুর দিকে শেষ সংবাদ সম্মেলনে জর্জ ডব্লিউ. বুশ নিজের একাধিক ভুলের তালিকা তুলে ধরেছিলেন, যার মধ্যে ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টিও ছিল। বারাক ওবামা যখন তার স্বাস্থ্য বিষয়ক শীর্ষ পদের মনোনীত প্রার্থী টম ড্যাশল বকেয়া কর অনাদায়ের কারণে নাম প্রত্যাহার করে নেন, তখন প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘আমি ভুল করে ফেলেছি।’

অ্যানস্লোভার বলেন, ট্রাম্পের আগের প্রেসিডেন্টরা সাধারণত ‘প্রকৃত অর্থেই দায়িত্ব গ্রহণ করতেন।’

কিন্তু ট্রাম্পের কথা হলো, ‘আমরা এক বিশাল দুর্যোগ বা বিপর্যয় উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।’

সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্বীকার করেন যে ভোটাররা ক্ষুব্ধ। তবে তিনি বলেন, জনগণ তার ওপর ক্ষুব্ধ নয়, বরং কংগ্রেসের রিপাবলিকানদের ওপর চটে আছেন।

ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, নভেম্বরের পর তার দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে। তবে তিনি আরও জানান, রিপাবলিকানরা যদি হেরে যায়, তবে সেটি তার দোষ হবে না।

২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেও একই কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। সেবারও তিনি বলেছিলেন, তার দল প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে তিনি তার দায় নেবেন না। শেষপর্যন্ত দল হেরেও গিয়েছিল।

/এএসএফ