১৯৭৯ সালে জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপে প্রায় ৩০টি বেজি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিষধর হাবু সাপের সংখ্যা কমানো। কিন্তু সাপ শিকার করার বদলে বেজিগুলো দ্বীপের বিরল ও স্থানীয় প্রাণীদের শিকার করতে শুরু করে। একপর্যায়ে মাত্র ৩০টি থেকে বেজির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজারে। এরপর এই প্রাণীগুলোকে নির্মূল করতেই জাপানের লেগে যায় কয়েক দশক। এ কাজে ব্যয় হয় বিপুল অর্থ। আর এই পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নামও।
ঘটনাস্থল জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপ। প্রায় ৭১২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ পরবর্তী সময়ে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়। দ্বীপটির বনাঞ্চলে এমন অনেক প্রাণীর বসবাস রয়েছে, যেগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। এর মধ্যে অন্যতম বিরল ও বিপন্ন আমামি খরগোশ।
তবে ১৯৭৯ সালে দ্বীপের মানুষের প্রধান উদ্বেগ ছিল এসব বিরল প্রাণী নয়। তখন তাদের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল হাবু—বিষধর এক ধরনের পিট ভাইপার সাপ।
আমামি দ্বীপপুঞ্জে দীর্ঘদিন ধরেই হাবুর কামড় মানুষের জন্য বড় ধরনের সমস্যা ছিল। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত আমামি ওশিমা, টোকুনোশিমা ও আশপাশের দ্বীপগুলোতে হাবুর কামড়ের ২ হাজার ৬৭৩টি ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছিল। ফলে সাপের সংখ্যা কমানোর কার্যকর কোনো উপায় খুঁজছিল কর্তৃপক্ষ।
বেজি যে সাপের শত্রু—এমন ধারণা প্রচলিত। ‘অহিনকুল সম্পর্ক’ কথাটিও এসেছে এই চরম শত্রুতার ধারণা থেকেই। তাই আমামি ওশিমার কর্তৃপক্ষ সাপের সমস্যা সমাধানে বেজিকেই সম্ভাব্য উপায় হিসেবে বেছে নেয়।
১৯৭৯ সালে জাপানের ওকিনাওয়া থেকে আমামি ওশিমায় প্রায় ৩০টি বেজি নিয়ে আসা হয়। তবে এই বেজিগুলোর পূর্বপুরুষের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগ রয়েছে। ১৯১০ সালে ব্রিটিশ ভারতের বাংলাদেশ অঞ্চল থেকে স্মল ইন্ডিয়ান মঙ্গুজ (Herpestes auropunctatus, বর্তমানে Urva auropunctata) প্রজাতির কিছু বেজি ওকিনাওয়া দ্বীপে নেওয়া হয়েছিল। আমামি ওশিমায় নেওয়া বেজিগুলো ছিল সেই বেজিগুলোরই উত্তরসূরি। পরবর্তী গবেষণাতেও বাংলাদেশ থেকে ওকিনাওয়া এবং সেখান থেকে আমামি ওশিমায় বেজিদের যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কর্তৃপক্ষের ধারণা ছিল, বেজি দ্বীপে থাকবে, সাপের সংখ্যা কমাবে এবং এতে মানুষ স্বস্তি পাবে। কিন্তু এই পরিকল্পনায় বেজি ও হাবু সাপের জীবনযাপনের পার্থক্যটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
হাবু মূলত নিশাচর প্রাণী। অন্যদিকে বেজি দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে। ফলে সাপ শিকারের জন্য দ্বীপে আনা বেজিদের সঙ্গে হাবু সাপের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগই ছিল সীমিত।
জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, বেজিগুলো হাবু সাপের পরিবর্তে আমামি খরগোশসহ দ্বীপের বিভিন্ন স্থানীয় প্রাণীর ওপর শিকারি হিসেবে প্রভাব ফেলেছিল।
দিনের বেলায় খাবারের সন্ধানে বের হয়ে বেজিগুলো বনের অন্যান্য প্রাণীকে সহজ শিকার হিসেবে পেতে থাকে। একই সঙ্গে আমামি ওশিমার পরিবেশও তাদের বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল ছিল। খাবারের অভাব ছিল না, বড় কোনো প্রাকৃতিক শিকারিও ছিল না। ফলে ৩০টি বেজি ধীরে ধীরে একটি বড় বেজিগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। ২০০০ সালের দিকে দ্বীপটিতে বেজির সংখ্যা আনুমানিক ১০ হাজারে পৌঁছে যায়।
তত দিনে বেজিদের শিকারের তালিকায় যুক্ত হয় আমামি খরগোশ, বিরল ব্যাঙ, স্থানীয় ইঁদুরসহ বিভিন্ন প্রজাতি। এমন কিছু প্রাণীও তাদের শিকারের শিকার হয়, যাদের বিবর্তনের ইতিহাসে এ ধরনের শিকারি প্রাণীর সঙ্গে তেমন পরিচয় ছিল না।
অর্থাৎ যে প্রাণীকে একটি সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে দ্বীপে আনা হয়েছিল, সেটিই একসময় আরও বড় পরিবেশগত সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৯০-এর দশকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বেজি ধরার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তত দিনে পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। শুরুতেই মাত্র ৩০টি বেজিকে ধরার কাজ যতটা সহজ হতে পারত, তখন সেটি আর সম্ভব ছিল না। বেজিগুলো ইতিমধ্যে দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
২০০০ সালে শুরু হয় বড় পরিসরের নির্মূল অভিযান। বেজি ধরতে ফাঁদ বসানো হয়, ব্যবহার করা হয় টোপ। ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারিও শুরু হয়। পরে বেজির গন্ধ শনাক্ত করতে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কুকুরও কাজে নামানো হয়। ২০০৫ সালে গড়ে তোলা হয় ‘আমামি মঙ্গুজ বাস্টার্স’ নামে বিশেষজ্ঞদের একটি দল।
অভিযান যত এগোতে থাকে, কাজ তত কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথম দিকে যেসব বেজি সহজে ফাঁদে ধরা পড়ত, ধীরে ধীরে সেগুলোর সংখ্যা কমে যায়। বেঁচে থাকা বেজিগুলো আরও সতর্ক হয়ে পড়ে এবং দুর্গম এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে যায়।
একপর্যায়ে জাপানকে পুরো দ্বীপে ৩০ হাজারের বেশি ফাঁদ এবং ৩০০টিরও বেশি ক্যামেরা বসিয়ে নজরদারি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা ছিল—৯৯ শতাংশ বেজিকে ধরে ফেললেও অভিযান শেষ করা সম্ভব নয়। কোথাও কয়েকটি বেজি, বিশেষ করে প্রজননক্ষম একটি স্ত্রী বেজি বেঁচে থাকলেও আবার বংশবিস্তার শুরু হতে পারে। তাই নির্মূল অভিযানের সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায় শেষ কয়েকটি বেজিকে খুঁজে বের করা।
২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে একটি বেজি ফাঁদে ধরা পড়ে। এরপর আর কোনো বেজির সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে তখনই জাপান ঘোষণা করেনি যে আমামি ওশিমা বেজিমুক্ত হয়েছে। কারণ, বিশাল একটি এলাকায় কোনো প্রাণীকে পুরোপুরি নির্মূল করা হয়েছে—এমন দাবি করা যতটা সহজ, তা প্রমাণ করা ততটাই কঠিন।
ফলে এরপরও ফাঁদ বসানো অব্যাহত থাকে। ক্যামেরায় নজরদারি চলতে থাকে। প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে অনুসন্ধানও চালানো হয়। বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে খুঁজতে থাকেন, দ্বীপের কোথাও কোনো বেজি লুকিয়ে আছে কি না।
অবশেষে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে, আমামি ওশিমা থেকে বেজি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বেজি নির্মূলের সম্ভাবনা ছিল ৯৮ দশমিক ৯ থেকে ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে যে সমস্যার সূত্রপাত হয়েছিল, তার চূড়ান্ত সমাধান করতে জাপানের লেগে যায় প্রায় ৪৫ বছর।
এই ভুলের মাশুল শুধু প্রাণপ্রকৃতিকেই দিতে হয়নি, বিপুল অর্থও ব্যয় হয়েছে। ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বেজি নির্মূল কর্মসূচিতে জাপানের খরচ হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ইয়েন। বর্তমান বিনিময় হার ধরে বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৯০ কোটি টাকা।
তবে বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, এই প্রকল্পের জন্য প্রত্যেক জাপানি গড়ে প্রায় ২ হাজার ৫৩৯ ইয়েন ব্যয় করতে রাজি ছিলেন। পুরো জাপানের সম্ভাব্য উপকারভোগীদের হিসাবে এই সামাজিক মূল্য দাঁড়ায় ২৫৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইয়েনের বেশি, যা ডলারে প্রায় ১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন।
অর্থাৎ বেজি নির্মূল প্রকল্পে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার তুলনায় এর সামাজিক মূল্য প্রায় ৭১ গুণ বেশি।
তবে এ ঘটনায় বেজিদের নিজেদের কোনো দোষ ছিল না। তারা নিজেরা হেঁটে জাপানে যায়নি। তাদের জানা ছিল না যে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে তাদের দ্বীপটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে—সাপ মারতে হবে, অন্য প্রাণীকে নয়। তারা কেবল বেঁচে থাকার জন্য নিজেদের স্বাভাবিক আচরণই করেছে। ভুলটি হয়েছিল মানুষের সিদ্ধান্তে।
একটি সমস্যা দ্রুত সমাধানের উদ্দেশ্যে মানুষ ভেবেছিল, প্রকৃতির একটি প্রাণীকে নতুন পরিবেশে ছেড়ে দিলেই সেটি মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কাজ করবে। কিন্তু কোনো প্রাণীকে একটি বাস্তুতন্ত্র থেকে সরিয়ে অন্য একটি বাস্তুতন্ত্রে নিয়ে গেলে তার আচরণ, খাদ্যাভ্যাস ও বংশবিস্তারের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আমামি ওশিমার বেজির ঘটনাটি তাই দেখিয়ে দিয়েছে, প্রকৃতির কোনো সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে গিয়ে নতুন একটি প্রাণীকে সেখানে ছেড়ে দিতে হয়তো খুব অল্প সময় লাগে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ভুল শুধরাতে লেগে যেতে পারে ৪৫ বছর।
/এসএন