গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলের দেইর আল-বালাহ শহরের একটি বালুময় পথ ধরে নীল, হলুদ ও সাদা রঙের একটি ফুটবল পায়ে নিয়ে হাঁটছিল ১৪ বছর বয়সী কারাম। দুই ভাই ও এক বোনকে নিয়ে বাস্তুচ্যুত জীবন কাটানো এই কিশোরের চোখে এখনো ফুটবলারের স্বপ্ন, যদিও সেই স্বপ্নকে ছাপিয়ে গেছে যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা।সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কারাম বলে, “আমার স্বপ্ন ছিল একজন ফুটবলার হওয়ার।
আগে বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তায় ফুটবল খেলতাম। যুদ্ধের আগের জীবন ছিল খুব সুন্দর। কিন্তু এখন আর কোনো জীবন নেই।”কারামের পরিচিত গাজা আজ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একসময় যেখানে নীল সমুদ্র আর দিগন্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত, সেখানে এখন দেখা যায় আগুনে পুড়ে যাওয়া কৃষিজমি, ছাই হয়ে যাওয়া ফলের বাগান এবং ধ্বংসস্তূপের সারি। যুদ্ধ শুধু ভবন ধ্বংস করেনি, বদলে দিয়েছে পুরো ভূদৃশ্য।এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চালালেও গাজার বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, তাঁরা এমন একটি মার্কিন-সমর্থিত সমঝোতার ধ্বংসাবশেষে বসবাস করছেন, যা কার্যকর হয়নি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইসরায়েল বিদেশি সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে গাজায় প্রবেশ করে সেখানকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়নি।২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর একই দিন থেকে গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল।
প্রায় দুই বছর ধরে টানা হামলা ও অবরোধের পর গত বছরের শরতে দুই পক্ষ দুই ধাপের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছায়।চুক্তিতে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন এবং নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসন গঠনের কথা থাকলেও শুরু থেকেই এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ইসরায়েল ও হামাস উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।যুদ্ধবিরতির আট মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তব অগ্রগতির তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং গত মে মাসে চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা নিকোলাই ম্লাদেনভ সতর্ক করে বলেন, গাজার মানুষ এখন একটি “বিপজ্জনক অচলাবস্থার” মধ্যে রয়েছে।অন্যদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গঠিত বোর্ড অব পিস গত বৃহস্পতিবার জানায়, সাইপ্রাসে তাদের দুই দিনের বৈঠক “অত্যন্ত ফলপ্রসূ” হয়েছে।
তবে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে এখনো কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের কমিটি কবে দায়িত্ব নেবে, সে বিষয়ে হামাস কোনো সময়সূচি দেয়নি। একইভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য যে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা ছিল, সেটিও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।এদিকে ইসরায়েল গাজায় সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরেও নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত করা হয়েছে এবং হামাস সদস্যদের লক্ষ্য করে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত মাসে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, তিনি সেনাবাহিনীকে গাজার ৭০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনে আরও এলাকা দখলেরও ইঙ্গিত দেন তিনি।অন্যদিকে হামাসও নিজেদের পুনর্গঠন করেছে। সংগঠনটি অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং গাজার ভেতরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে।ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ২১ জুন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৫৯ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৪২৯ জন আহত হয়েছেন।স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে সিএনএনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত অক্টোবর থেকে গড়ে প্রতিদিন একজন করে শিশু নিহত হয়েছে গাজায়।
জুনে প্রকাশিত জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানোর মাধ্যমে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল।গাজার বাসিন্দাদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক কূটনীতিকেরা যতই শান্তির কথা বলুন না কেন, তাঁদের বাস্তবতায় যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।দেইর আল-বালাহর বাস্তুচ্যুত ত্রাণকর্মী সালি সালেহ বলেন, “যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায় বোমা হামলা হতে পারে। এখানে প্রকৃত অর্থে কোনো যুদ্ধবিরতি নেই।”জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ১৯ লাখের বেশি মানুষ, অর্থাৎ প্রায় পুরো জনসংখ্যাই বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাঁদের অনেককে একাধিকবার আশ্রয় বদলাতে হয়েছে।যুদ্ধবিরতির কয়েক মাস পরও অসংখ্য মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন।
সেখানে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই। মে মাসের শেষ দিকে জাতিসংঘ সতর্ক করে জানায়, এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ত্বকের র্যাশ ও পরজীবী সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুত মানুষের বসবাসের ৮০ শতাংশেরও বেশি এলাকায় এ ধরনের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।একই সঙ্গে ভয়াবহ আকার নিয়েছে ইঁদুর, তেলাপোকা ও বেজির উপদ্রব। এসব প্রাণী তাঁবুর কাপড় ছিঁড়ে ভেতরে ঢুকে ঘুমন্ত শিশু, এমনকি নবজাতকদেরও কামড়ে দিচ্ছে।যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানস (এমএপি)-এর জরুরি কার্যক্রমের প্রধান সালি সালেহ বলেন, “আমরা এমন অনেক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছি, যাঁদের সন্তানদের ইঁদুর কামড়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, আবারও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।”গাজা সিটির পানি সরবরাহ কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র হুসনি নাদিম মোহান্না জানান, শৌচাগারের তীব্র সংকটের কারণে অনেকেই অস্থায়ী পায়খানার গর্ত খুঁড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
এতে মাটি ও পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ছে।ইঁদুরের উৎপাত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা ত্রাণসামগ্রীর প্যাকেটও কেটে ফেলছে। ফলে অনেক পরিবার চাল বা আটা ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছে। কেউ কেউ খাবার রক্ষায় তাঁবুর ছাদ থেকে খাবারের পাত্র ঝুলিয়ে রাখছেন।গত মাসে ইসরায়েল সরকার জানিয়েছে, জাতিসংঘের সহযোগিতায় গাজার বিভিন্ন এলাকায় বড় পরিসরে কীটপতঙ্গ ও ইঁদুর দমন অভিযান শুরু হয়েছে।তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয়। তাদের মতে, জেনারেটর ও প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ প্রবেশে বিধিনিষেধ এবং ত্রাণকর্মীদের নিহত হওয়ার ঘটনায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।এমএপির জরুরি কার্যক্রমের প্রধান সালি সালেহ বলেন, এসব বিধিনিষেধের কারণে অনেক মানবিক সংস্থাকে তাদের কার্যক্রম সীমিত করতে হচ্ছে, এমনকি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের মতো জরুরি সেবাও। তাঁর ভাষায়, “এর ফলে গাজার মানুষের ওপর চাপ ও দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাচ্ছে।”
সূত্র: সিএনএন
/বিএসএস