মাত্র ১৫ সপ্তাহ আগেও ইরান ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে সময় তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া তেহরানের সঙ্গে কোনো ধরনের চুক্তি হবে না। তবে বুধবার (১৭ জুন) যুদ্ধবিরতির সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত প্রকাশের পর দেখা যায়, সেটি আত্মসমর্পণের দলিল নয়; বরং এতে ইরানের জন্য বেশ কয়েকটি সুবিধাজনক বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সমঝোতার ফলে ইরান আবারও তেল রপ্তানির বড় সুযোগ ফিরে পেয়েছে। এর মাধ্যমে শত শত কোটি ডলার আয়ের পথ উন্মুক্ত হওয়ায় দেশটির অর্থনৈতিক চাপ অনেকটাই কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং দেশটির সরকারকে দুর্বল করে দেওয়া। কিন্তু সমঝোতা চুক্তিতে সেই লক্ষ্যগুলোর কোনোটি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং ইরান যুদ্ধের পর এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে, যা তারা নিজেদের জন্য ইতিবাচক ফলাফল হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে।
চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, এর মাধ্যমে আগামী ১৫ থেকে ২০ বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার প্রদর্শন ও কঠোর দর কষাকষির জন্য পরিচিত একজন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এমন সমঝোতায় সম্মত হওয়া অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার সম্ভাবনাও চুক্তিতে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা ইরানের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সমঝোতার আওতায় ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফেরত পাওয়ার পথও খুলে যাচ্ছে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ভালো আচরণের প্রতিদান হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। তবে সমালোচকদের দাবি, এটি অনেকটা ২০১৫ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দেওয়া ছাড়ের মতো, যার তীব্র সমালোচনা করেই একসময় রাজনৈতিক সুবিধা নিয়েছিলেন ট্রাম্প।
এদিকে রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থী অংশ এবং ইসরায়েলের চরম ডানপন্থী সরকার ইতোমধ্যে এই চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতির ফলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান অভিযান ব্যাহত হতে পারে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প স্বীকার করেন, তিনি চাননি ইতিহাসে তাকে এমন একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখা হোক, যার সময় অর্থনৈতিক বিপর্যয় শুরু হয়েছিল। তার আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার সক্ষমতা দেখিয়ে এই চাপ তৈরি করতে পেরেছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যদিও ট্রাম্প দাবি করছেন, তিনি ইরানকে উত্তর কোরিয়ার মতো পথে যেতে দেবেন না, বাস্তবে এই সমঝোতা পারমাণবিক ইস্যুতে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন, এই আলোচনা ৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় বহন করতে হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন মার্কিন সেনা এবং তিন হাজারের বেশি ইরানি। তবে যুদ্ধ শেষে ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার পরিবর্তে আরও শক্তিশালী অবস্থানে যাচ্ছে— এমন ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। ফলে এই সমঝোতা থেকে ট্রাম্প কতটা রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বিজয় দাবি করতে পারবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
/এসএন