ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুতদের জন্য ২৩২টি বাড়ি নির্মাণ করে দিল সৌদি আরব
সংঘাতকবলিত প্রতিবেশী দেশ ইয়েমেনে মানবিক সহায়তা আরও জোরদার করার অংশ হিসেবে দেশটির হাজ্জাহ গভর্নরেটে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য ২৩২টি সুবিধাসংবলিত আবাসন ইউনিট হস্তান্তর করেছে সৌদি আরব।
সৌদি ত্রাণ সংস্থা ‘কেএসরিলিফ’ পরিচালিত এ প্রকল্পের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ সুবিধাসহ তৈরি বাড়ি, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি মসজিদ এবং শিশুদের জন্য দুটি খেলার মাঠ নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় আশ্রয়দাতা কমিউনিটির ১৫০টি পরিবারকে অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সরবরাহ করা হয়েছে।
সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) বৃহস্পতিবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ১ হাজার ৯৯৪ জন মানুষ উপকৃত হবেন। এর ফলে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো আরও স্থিতিশীল জীবনযাপন এবং মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে।
প্রতিটি আবাসন ইউনিটে রয়েছে দুটি কক্ষ, দুটি বাথরুম, একটি রান্নাঘর এবং একটি খোলা উঠান। আবাসন কমপ্লেক্সের বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সুবিধার জন্য আনুষঙ্গিক এসব প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে।
সৌদি আরব, দেশটির নেতৃত্ব ও জনগণের অব্যাহত মানবিক সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন হাজ্জাহর গভর্নর আব্দুলকারিম আল-সুনাইনি। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের কষ্টের পর এ প্রকল্প বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে নতুন করে জীবন গড়ে তোলার সুযোগ এনে দিয়েছে।
আবাসন প্রকল্প হস্তান্তরের পাশাপাশি চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনে আরও কয়েকটি ত্রাণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে সৌদি আরব।
লাহাজ গভর্নরেটে জরুরি আশ্রয় কর্মসূচির ষষ্ঠ পর্যায়ের অংশ হিসেবে তুবান জেলার সাম্প্রতিক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে ৯০টি তাঁবু ও ৯০টি শেল্টার কিট বিতরণ করেছে কেএসরিলিফ। পাশাপাশি সেখানে নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহ করা হয়েছে, যা ১ হাজার ৯১৯ জন বাস্তুচ্যুত মানুষ ও অসচ্ছল পরিবারকে সহায়তা দিয়েছে।
প্রতিবেশী এডেন গভর্নরেটে ১৪টি পয়েন্টের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৩৭টি পরিবারের মধ্যে ৪৫৪টি পানি সংরক্ষণের পাত্র বিতরণ করা হয়েছে।
আল-বুরাইকাহ জেলায় পৃথক একটি জরুরি পানি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৮০০ মানুষকে পানযোগ্য পানি দেওয়া হচ্ছে। এ উদ্যোগের আওতায় কংক্রিটের বেদির ওপর ২১টি পানির ট্যাংক স্থাপন, পানি বিতরণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং ৮০০টি কন্টেইনার বিতরণ করা হয়েছে। পানির গুণমান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরীক্ষাগারেও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
অসচ্ছল ও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা, দূষিত পানির কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোই এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
সর্বশেষ এসব প্রকল্প ইয়েমেনে সৌদি আরবের ধারাবাহিক মানবিক সহায়তার চিত্র তুলে ধরেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মৌলিক সেবার ঘাটতির কারণে দেশটির লাখ লাখ মানুষ এখন ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সরকার ও ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যকার সংঘাতের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের অবকাঠামো ও অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জাতিসংঘের ২০২৬ সালের মানবিক চাহিদা ও সহায়তা পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইয়েমেনে আনুমানিক ২ কোটি ২৩ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫২ লাখ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত। এ ছাড়া ১ কোটি ৮৩ লাখের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কেএসরিলিফের মাধ্যমে ইয়েমেনে সর্বোচ্চ পরিমাণ ত্রাণ দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব অন্যতম। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানটি খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন, শিক্ষা, পুষ্টি এবং সুরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করছে।
এর আগেও সংস্থাটির অধীনে ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচি পরিচালনা এবং শরণার্থী ও সংকটাপন্ন মানুষের মধ্যে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে।
জরুরি ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, মৌলিক সেবা পুনর্বহাল এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের টেকসই পুনর্বাসনের লক্ষ্যেই সৌদি আরব এসব আবাসন ও পানি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
/এএসএফ