পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর নিজেকে বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অভিনয়ের পাশাপাশি স্পষ্টবাদিতা, সাদাসিধে জীবনযাপন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণেও আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছিল তার। খ্যাতি ও অর্থের হাতছানি থাকলেও বিলাসী জীবনযাপনের প্রতি খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না এই অভিনেতা।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার ডোনা পাউলায় নিজ বাসভবনে মারা যান নানা পাটেকর। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তিনি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চিকিৎসকেরা দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি।
নানা পাটেকর বরাবরই নিজের মতো করে চলেছেন। ‘রাজনৈতিক শুদ্ধতার’ ধার না ধরা, নিজের মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা কিংবা কাজের ক্ষেত্রে আপস না করার কারণে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কেও জড়িয়েছেন তিনি। পরিচালক-প্রযোজকদের সঙ্গে বিবাদের ঘটনাও রয়েছে তার ক্যারিয়ারে। এমনকি নিজের একগুঁয়েমির কারণে বেশ কিছু কাজ হাতছাড়া হয়েছে বলেও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এসব নিয়ে খুব একটা আক্ষেপ করেননি তিনি।
অভিনয় প্রতিভার কারণে ক্যারিয়ারের মধ্যগগনেই প্রথম সারির তারকাদের কাতারে জায়গা করে নেন নানা। চাইলে অন্য অনেক তারকার মতো বিলাসী জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তার জীবনযাপন ছিল বরাবরই সাধারণ। রূপালি পর্দার ঝলমলে দুনিয়ার বাইরেও তিনি ছিলেন অনেকটাই নিভৃতচারী।
মানুষের পাশে নানা
নানা পাটেকরের মানবিক কর্মকাণ্ডের কথাও বহুবার সামনে এসেছে। মহারাষ্ট্রের লাতুরের কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে দুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সহায়তা এবং বন্যাকবলিতদের জন্য ত্রাণ—বিভিন্ন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘নাম ফাউন্ডেশন’ও কাজ করেছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নানা পাটেকর নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতেন। এমনকি তার আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে দান করার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অর্থ-সম্পদের প্রতি অনুরাগের বদলে মানুষের পাশে দাঁড়ানোতেই যেন বেশি তৃপ্তি খুঁজে নিতেন এই অভিনেতা।
এক কামরার ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন
ব্যক্তিজীবনেও তার সেই সরলতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকার সময়ও মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে একটি এক কামরার ফ্ল্যাটে মায়ের সঙ্গে থাকতেন নানা। কয়েক দশক আগে প্রায় ৭৫০ বর্গফুটের ওই ফ্ল্যাটটি প্রায় ১ দশমিক ১ লাখ রুপিতে কিনেছিলেন বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন সেখানেই কাটিয়েছেন তিনি।
সবুজের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা ছিল নানার। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করতেন তিনি। তাই পুনেতে গড়ে তোলেন প্রায় ২৭ একর জমির একটি খামারবাড়ি। সুযোগ পেলেই সেখানে নিজের হাতে চাষাবাদ করতেন। সেই খামারবাড়ির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবিকাও যুক্ত ছিল। সেখান থেকে পাওয়া আয় প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জীবনের শেষদিকে গোয়ার ডোনা পাউলায় একটি বড় বাড়িও কিনেছিলেন নানা পাটেকর। সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও জায়গাটি ছিল শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে। শেষ সময়ে মুম্বাই, পুনে ও গোয়ার বাড়ির মধ্যে সময় ভাগ করে নিতেন তিনি। তবে পুনের খামারবাড়িতে সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করতেন বলে জানা যায়।
সম্পদও ছিল তুলনামূলক সীমিত
অভিনয়ের সুবাদে বিপুল অর্থ উপার্জন করলেও নানার সম্পদের পরিমাণ তার জনপ্রিয়তার তুলনায় খুব বেশি ছিল না বলেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যারিয়ারের শেষ দিকেও ছবিপ্রতি প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি রুপি পারিশ্রমিক পেতেন তিনি।
মুম্বাইয়ের ফ্ল্যাট, পুনের খামারবাড়ি ও গোয়ার বাড়িসহ তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ কোটি রুপি বলে জানা যায়।
তার জীবনযাপনের সরলতার আরেকটি উদাহরণ ছিল গাড়ির সংখ্যাও। এত বড় মাপের অভিনেতা হয়েও তার মালিকানায় ছিল মাত্র তিনটি গাড়ি। সেগুলোর কোনোটিই অতিমূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি ছিল না।
তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও পদ্মশ্রীসহ একাধিক সম্মানে ভূষিত নানা পাটেকর জীবনের শেষ সময়ও অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে কাটিয়েছেন। প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে তিনি হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘গমন’ দিয়ে ১৯৭৮ সালে চলচ্চিত্রজীবন শুরু করে পরে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘প্রহার’, ‘খামোশি’, ‘ওয়েলকাম’সহ বিভিন্ন ছবিতে নিজের অভিনয়ের স্বাক্ষর রাখেন। তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও পদ্মশ্রী ছিল তার অর্জনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি।
নানার প্রয়াণে বলিউড ও অভিনয়জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার অভিনয়ের জন্য পাওয়া স্বীকৃতির পাশাপাশি মানুষের জন্য নীরবে কাজ করে যাওয়া এবং সাধারণ জীবনযাপনের কারণে তৈরি হওয়া মানবিক পরিচয়ও ভক্তদের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
/এএসএফ