মানবিকতা ও খরিদ্দারদের প্রতি অতিরিক্ত বিশ্বাসের কারণে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন পিরোজপুরের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। দীর্ঘ সাত বছর ধরে বাকিতে মালামাল বিক্রি করতে গিয়ে তার কাছে জমেছে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা বকেয়া। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তিলে তিলে গড়ে তোলা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
নিরুপায় হয়ে পাওনা টাকা আদায়ে এবার অভিনব এক পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন পিরোজপুর সদর উপজেলার পাড়েরহাট সংলগ্ন দক্ষিণ শংকরপাশা এলাকার ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম বাদশা। খরিদ্দারদের বকেয়া পরিশোধের অনুরোধ জানিয়ে তিনি এখন রাস্তায় রাস্তায় মাইক ভাড়া করে মাইকিং করছেন।
শনিবার (১৬ মে) সকালে সরেজমিনে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, একসময় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন সাইফুল ইসলাম বাদশা। পরে পরিবারের টানে গ্রামে ফিরে এসে ‘মেসার্স আদিল আহনাফ এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘মেসার্স হাওলাদার ব্যাটারি’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন। সেখানে মুদি মালামালের পাশাপাশি ইজিবাইক, ব্যাটারি ও বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ বিক্রি শুরু করেন তিনি।
২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছরে তার অধিকাংশ খরিদ্দার ছিলেন স্থানীয় অটো ও ইজিবাইক চালক। অভাবের সময় চালকদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তিনি বিপুল পরিমাণ মালামাল ও ব্যাটারি বাকিতে দেন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, মালামাল নেওয়ার পর অনেক চালকই আর দোকানে আসেননি। বরং তারা সাইফুলকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। এভাবে বছরের পর বছর ধরে বকেয়ার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকায়।
এই আর্থিক সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টা হিসেবে গত ১৩ মে থেকে ১৫ মে পর্যন্ত হালখাতার আয়োজন করেন সাইফুল ইসলাম। কিন্তু সেখানেও আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। তিন দিনে প্রায় ৪৫ লাখ টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।
পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি মাইকিং শুরু করেছেন।
সাইফুল ইসলাম বাদশা বলেন, ‘আমি চরম দিশাহারা। মানুষ উপকারের মূল্য দেয় না। এখন মাইকিং করে সবাইকে বকেয়া পরিশোধের অনুরোধ জানাচ্ছি। এতেও যদি কাজ না হয়, তবে পাওনাদারদের বাড়ির সামনে গিয়ে নাম ধরে ধরে মাইকে বকেয়া টাকার কথা প্রচার করব।’
তার এই সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের মানুষজন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী হাসান হাওলাদার বলেন, সাইফুল অত্যন্ত নিষ্ঠা ও মানবিকতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। কিন্তু মানুষের অসততার কারণে আজ তার ব্যবসা ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
তবে হালখাতায় টাকা জমা দিতে আসা ইজিবাইক চালক মো. হৃদয় ইতিবাচক একটি উদাহরণ তৈরি করেছেন। তিনি জানান, বিপদের সময় সাইফুলের কাছ থেকে বাকিতে ব্যাটারি নিয়ে গাড়ি চালিয়েছেন এবং এখন তিনি তার সব বকেয়া পরিশোধ করেছেন।
স্থানীয়দের আশা, হৃদয়ের মতো অন্য পাওনাদার ও চালকরাও দ্রুত বকেয়া টাকা পরিশোধ করে এই মানবিক ব্যবসায়ীর পাশে দাঁড়াবেন।
/এসএন