বিরল ও জটিল স্নায়বিক রোগ ‘মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস’-এ আক্রান্ত হয়েও শঙ্কা জয় করে মা হয়েছেন তানিয়া খাতুন। চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে তিন বছর পর তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এ ঘটনাকে রাজশাহীতে বিরল হিসেবে উল্লেখ করেছেন চিকিৎসকেরা।
রোববার (৩ মে) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার সন্তান জন্মগ্রহণ করে। বর্তমানে মা ও নবজাতক দুজনই সুস্থ রয়েছেন। তবে বাড়তি সতর্কতার অংশ হিসেবে তানিয়াকে আইসিইউতে এবং শিশুকে বিশেষ সেবা ইউনিট (স্ক্যানু)-তে রাখা হয়েছে।
তানিয়া খাতুন (২৫) রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ পলাশবাড়ী গ্রামের কৃষক জেবর আলীর স্ত্রী। তাদের আরও একটি আট বছর বয়সী কন্যাসন্তান রয়েছে।
‘মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস’ একটি দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন স্নায়বিক রোগ। এ রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভুলবশত স্নায়ু ও পেশির সংযোগস্থলে আক্রমণ করে। ফলে মস্তিষ্ক থেকে পেশিতে সংকেত পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হয় এবং পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। রোগটি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
২০২৩ সালের শুরুতে হঠাৎ চোখের পাতা পড়ে যাওয়া এবং তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে তানিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তার শরীরে ‘মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস’ শনাক্ত হয়। এরপর তাকে ২১ দিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় এবং প্রায় আড়াই মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। পরবর্তীতে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
তিনি আরও জানান, ২০২৩ সালের ২৫ জানুয়ারি তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিল ইমিউনোগ্লোবিউলিন, যার খরচ ছিল ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা। কৃষক স্বামীর পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা সম্ভব না হওয়ায় বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। নিউরোমেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক কফিলউদ্দিন এবং মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক আজিজুল হক আজাদের পরামর্শে রোগীর শরীর থেকে দূষিত রক্তরস বের করে নতুন রক্তরস দেওয়া হয়। এভাবে পাঁচ দফা চিকিৎসা দেওয়ার পর ১০ দিনের মধ্যে লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া সম্ভব হয়। যদিও মাঝখানে সংক্রমণের জটিলতাও দেখা দেয়। পরে ২১ দিন পর তাকে আইসিইউ থেকে নিউরো ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। রাজশাহীতে এ ধরনের চিকিৎসা এটাই ছিল প্রথম।
২০২৩ সালের মার্চে চিকিৎসা শেষে তাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠানো হয় এবং ভবিষ্যতে সন্তান না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে তানিয়া তার স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন এবং জানান, সতর্কতা সত্ত্বেও তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন। এ অবস্থায় অনেক চিকিৎসক গর্ভপাতের পরামর্শ দিলেও তারা তা মানেননি। আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রথমে আপত্তি জানালেও পরে তাদের ইচ্ছাশক্তিকে সমর্থন করেন। এরপর তার তত্ত্বাবধানে নিয়মিত গাইনি ও নিউরোলজি বিভাগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়।
শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক রোকেয়া খাতুনের নেতৃত্বে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তানিয়ার সন্তান জন্মগ্রহণ করে। এ প্রসঙ্গে আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, “আমার ৩১ বছরের চিকিৎসক জীবনে অনেক জটিল রোগীর চিকিৎসা করেছি। তবে লাইফ সাপোর্টে থাকা রোগীর সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্মের ঘটনা আগে দেখিনি।” তিনি এটিকে হাসপাতালের গাইনি, অ্যানেসথেসিয়া, মেডিসিন, নিউরোলজি ও আইসিইউ বিভাগের সম্মিলিত সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
/এসএন