শুক্রবার সকাল থেকে হালকা বৃষ্টি থাকলেও দুপুরে কিছুটা বিরতি ছিল। তবে বিকেলের দিকে আবার আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায় এবং চারপাশে অন্ধকার নেমে আসে। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে হাওড়পারের কৃষকদের চোখে ঘুম নেই, মনেও নেই স্বস্তি। তাদের চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে পাকা ধান, অথচ অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
শুক্রবার (১ মে) বিকাল ৩টার দিকে নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় গিয়ে কৃষকদের মধ্যে ফসল হারানোর বেদনা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ভারি বর্ষণ ও ঢলের পানিতে যেখানে ফসল ঘরে তোলার আনন্দ থাকার কথা ছিল, সেখানে নেমে এসেছে নিঃশব্দ কান্না।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দেখতে এদিন ঘটনাস্থলে যান নেত্রকোনা-2 আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক আনোয়ারুল হক। তাকে দেখে কয়েকজন কৃষক কান্নায় ভেঙে পড়েন। বাহিরকান্দা গ্রামের কৃষক খালেক নেওয়াজ ও শাজাহান মিয়া বলেন, “সব ফসল শেষ, পুরো বছর কেমনে চলবাম? কিতা খাইবাম?”
তারা আরও জানান, দিন-রাত পানি বাড়ছে এবং পাকা ধান চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে। সময়মতো ধান কাটতে না পারায় এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তারা বলেন, দেড় হাত পানি কমলে কিছু ধান ভেসে উঠতে পারে, কিন্তু পানি কমার কোনো লক্ষণ নেই। “বউ বাচ্চারে কেমনে বাঁচাইবাম?”—এ প্রশ্ন তাদের কণ্ঠে।
কৃষকদের অভিযোগ, এখন পানিতে ধান কাটার জন্য শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। এর সঙ্গে যাতায়াত বাবদ প্রতিজনকে ১৫০ টাকা এবং ধানের আঁটি তোলার জন্য নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে প্রায় ৫০০ টাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাওড়ের বুক থেকে ছোট ছোট নৌকায় করে ধান আনা হচ্ছে। পাড়ে পৌঁছে কৃষকরা আঁটি তুলে শুকনো স্থানে রাখছেন। কেউ যন্ত্রে মাড়াই করছেন, কেউ ভেজা ধান স্তূপ করে রাখছেন, আবার কেউ বস্তায় ভরে রাখছেন। শ্রমিকরা মাথায় বা কাঁধে করে সেই ধান শুকনো জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন।
হাজিগঞ্জ এলাকার কৃষক জালাল মিয়া বলেন, “আমার সাড়ে পাঁচ একর জমি। কাটতে পারছি এক একর মতো। গত চার দিনে পানি এত বেড়েছে যে ধানের শিষের আগা পর্যন্ত ডুবে গেছে। এখন আর কাটার সুযোগ নাই।”
একই এলাকার আরেক কৃষক ফরিদ তালুকদার বলেন, “শ্রমিক নাই, নৌকা নাই, শুকানোর জন্য রোদ নাই। কাটা ধান পচে নষ্ট হচ্ছে। পাঁচ-ছয়শ টাকা দামেও কেউ কিনতে চায় না। ঋণ করে চাষ করেছি, এখন সব পানির নিচে।”
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। শুক্রবার পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয়দের ধারণা, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। পাশাপাশি শিলাবৃষ্টিতেও ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
খালিয়াজুরী উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত হাওড়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বাকি অর্ধেক জমির ধান এখনো মাঠে রয়েছে, যা পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে।
হাওড়াঞ্চলের কৃষকদের পুরো বছরের জীবিকা নির্ভর করে বোরো ফসলের ওপর। এই ফসল নষ্ট হলে ঋণ শোধ, সংসার চালানো এমনকি খাদ্যের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
পাঁচহাট গ্রামের কৃষক কাদির মিয়া বলেন, “চোখের সামনে সব ডুবে যাচ্ছে। কেমনে ঋণ শোধ করব, পরিবার চালাব—কিছুই বুঝতে পারছি না।”
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, যা নতুন করে ঢল নামিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমানে মাঠে থাকা প্রায় ৮০ শতাংশ পাকা ধান খুব ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত কেটে ফেলা সবচেয়ে নিরাপদ। এখনো কোনো ফসল রক্ষা বাঁধ ভাঙেনি, তবে বৃষ্টির পানিতে ক্ষতি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ধনু নদীর খালিয়াজুরী পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে। কংস নদীর পানি জারিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ১০৭ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা মাঠে অবস্থান করছেন এবং বাঁধ রক্ষায় প্রস্তুত আছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন। এর মধ্যে হাওড় অঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ধনু নদে পানি কিছুটা বেড়েছে। তিনি খালিয়াজুরী হাওর পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা মাঠে রয়েছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল হক ক্ষতিগ্রস্ত বারহাট্টা উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন পরিদর্শন করে বলেন, কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে এবং এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা করা হবে।
/এসএন