দ্বীপজেলা ভোলার একটি সুপারি বাগানে সন্ধান মিলেছে ৩০০ থেকে ৪০০ বছরের পুরনো এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদের। চুন-সুরকির গাঁথুনি এবং মুঘল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ থাকা প্রাচীন এই স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। সম্প্রতি মসজিদটির অস্তিত্ব জানার পর সরেজমিনে এটি পরিদর্শন করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে মসজিদটির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে। এর নির্মাণকাল ও ইতিহাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি স্থাপনাটি সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো মসজিদটির প্রকৃত নির্মাণকাল, প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মসজিদটি ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাংলাবাজার এলাকার মোইজুদ্দিন মাঝি বাড়ির সুপারি বাগানে অবস্থিত। স্থানীয়দের কাছে এটি নেগাবান মসজিদ, টনির মসজিদ এবং মাঝি বাড়ির মসজিদ নামে পরিচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মসজিদটির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের নজরে আসে। পরে অধিদফতরের চার সদস্যের একটি দল মসজিদটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে।
পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, বর্গাকার ভূমি পরিকল্পনার ওপর মসজিদটি নির্মিত। এর দেয়াল চুন-সুরকির গাঁথুনিতে তৈরি। ছাদের ওপর রয়েছে অর্ধগোলাকার একটি গম্বুজ। স্থাপনাটির দৈর্ঘ্য ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি, প্রস্থ ১৯ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় আড়াই ফুট।
মসজিদের সম্মুখ দেয়ালের নকশা ও নির্মাণশৈলীতে মুঘল স্থাপত্যরীতির ছাপ রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, এটি মুঘল আমলের শেষভাগ অথবা ১৭ শতকের শেষভাগ থেকে ১৮ শতকের শুরুর দিকে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।
নবাব মুর্শিদ কুলি খানের আমলে এ অঞ্চলে মুসলিম জনবসতি গড়ে ওঠা এবং ইসলাম প্রচারের ধারাবাহিকতায় মসজিদটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ ধারণার পক্ষে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো ঐতিহাসিক দলিল এখনো পাওয়া যায়নি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের পরিদর্শন দলের পর্যবেক্ষণে মসজিদটির ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, স্থাপত্যগত এবং নান্দনিক গুরুত্ব রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। স্থাপনাটির নির্মাণকাল নির্ধারণ, সংরক্ষণের উপযোগিতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর সংরক্ষণের প্রস্তাব পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রাচীন এই মসজিদটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এটি ভোলার একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক দর্শনার্থী সেখানে আসছেন। তবে যাতায়াতের রাস্তা খারাপ হওয়ায় তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
ঐতিহাসিক স্থাপনাটির গুরুত্ব বিবেচনায় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান তিনি। তার মতে, রাস্তার উন্নয়ন করা হলে দর্শনার্থীদের যাতায়াত সহজ হবে এবং মসজিদটি সংরক্ষণে বিভিন্ন সংস্থাও আগ্রহী হতে পারে।
মসজিদ-সংলগ্ন বাড়ির এক বাসিন্দা জানান, প্রাচীন এই স্থাপনা দেখতে এসে অনেকেই এটি সংরক্ষণের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। সরকারিভাবে মসজিদটির সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে ভোলার ঐতিহ্য দেশ-বিদেশে তুলে ধরা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মসজিদে যাওয়ার রাস্তাটি সংস্কারেরও দাবি জানান তিনি।
এদিকে দ্বীপজেলা ভোলায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় এখন পর্যন্ত কোনো নিদর্শন নেই। ফলে প্রাচীন এই মসজিদটি সংরক্ষণের আওতায় এলে জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এবং সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটি সংরক্ষণ করা হবে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ভোলার প্রাচীন জনপদ, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যশৈলীর ইতিহাস তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
/এসএন