সুপারিশপ্রাপ্তদের তালিকায় নিজের নাম দেখে চাকরির স্বপ্ন যেন হাতের নাগালে চলে এসেছিল মো. সাজ্জাদ হোসেনের। ৪৯তম বিসিএসের (বিশেষ) পরীক্ষায় শিক্ষা ক্যাডারে চাকরি হবে—এমন আশায় নতুন জীবনের প্রস্তুতিও শুরু করেছিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী। কিন্তু চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর সেই স্বপ্ন থমকে গেছে। সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও চূড়ান্ত গেজেটে স্থান হয়নি তার নামের।
সাজ্জাদের দাবি, ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে গোপালগঞ্জের ১১ জন প্রার্থী শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৯ জনের নাম চূড়ান্ত গেজেটে রাখা হয়নি। বাদ পড়া সবাই গোপালগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা বলেও দাবি করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত জেলার মাত্র দুজন প্রার্থীর নাম গেজেটে রয়েছে।
চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে গোপালগঞ্জের প্রার্থীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার মহারাজপুর গ্রামের তরুণ সাজ্জাদ হোসেন। তার প্রশ্ন, কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা ফৌজদারি মামলা না থাকা সত্ত্বেও সুপারিশ পাওয়ার পর কেন গেজেট থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হলো।
সাজ্জাদের বাবা প্রয়াত সৈয়দ গোলাম মোস্তফা সেটেলমেন্ট অফিসে সর্দার আমিন পদে চাকরি করতেন। চাকরির সুবাদে তিনি গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মা গৃহিণী। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা সাজ্জাদের তিন ভাই প্রবাসে থাকেন। তার ছোট ভাই তিতুমীর কলেজে পড়াশোনা করছেন। তিন বোনেরই বিয়ে হয়েছে।
ফরিদপুরের নগরকান্দার বানেশ্বরদী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ফরিদপুর সরকারি ইয়াছিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন সাজ্জাদ। এরপর ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। একই বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।
এশিয়া পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাজ্জাদ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। পড়াশোনাতেই তার পুরো মনোযোগ ছিল। তার দাবি, বিভাগের প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি প্রথম অথবা দ্বিতীয় হয়েছেন।
৪৯তম বিশেষ বিসিএসের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মেধাক্রমে ৩০তম হন সাজ্জাদ। এরপর সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার খবর পেয়ে চাকরিতে যোগদানের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর সেখানে নিজের নাম না দেখে হতাশ হয়ে পড়েন।
সাজ্জাদ বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। জীবনে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম না। অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। বাবা বেঁচে নেই। ভাইয়েরা বিদেশে থেকে অর্থ দিয়ে আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। সুপারিশ পাওয়ার পর গেজেটে নাম না থাকায় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই। ১২ অক্টোবরের মধ্যে চাকরিতে যোগদানের বিষয়ে নিশ্চয়তা চাই। না হলে আমার মৃত্যু ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমার এখন সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। আমি আমার স্বপ্নটা পূরণ হোক সেটাই চাই।’
সাজ্জাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শিক্ষকও তার কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথা জানেন না বলে জানিয়েছেন। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাহাদাৎ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ২০১৯ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর বিবিএর দ্বিতীয় সেমিস্টার থেকে এমবিএ পর্যন্ত সাজ্জাদকে পড়িয়েছেন।
সাহাদাৎ হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সাজ্জাদকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে দেখেননি তিনি। তার ভাষায়, ‘সে আমাদের বিভাগের ভালো শিক্ষার্থীদের একজন ছিল। ফলাফলের দিক থেকেও সে সব সময় প্রথম অথবা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকত। নিঃসন্দেহে সে মেধাবী শিক্ষার্থী।’
সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও চূড়ান্ত গেজেটে সাজ্জাদের নাম না থাকার বিষয়টি শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন এই শিক্ষক। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগের সময়ের বিষয়ে তার কোনো তথ্য জানা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাহাদাৎ হোসেন আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার সবকিছুই ভালো ছিল। বিষয়টি আরও পর্যালোচনা করা হলে পুরো ঘটনাটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে পাশাপাশি সাজ্জাদের জন্যও ভালো কিছু হবে বলে মনে করি।’
/এসএন