• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম


সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আসছে সুখবর, উঠতে পারে নি’ষেধাজ্ঞা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১ অক্টোবর ২০২৬ ৭:৫০ পিএম

কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াত ও ভ্রমণসংক্রান্ত বিধিনিষেধে বেশ কিছু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। পর্যটকদের রাত্রিযাপন এবং দ্বীপে ভ্রমণের সময়সীমাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা, পরিবেশবিদ, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়।

পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘একদিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, একইসঙ্গে সেখানকার জীবন-জীবিকার বিষয়গুলোও যেন নিশ্চিত করা যায় সে অনুযায়ী আমরা একটা গাইডলাইন তৈরি করবো।’

এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্বীপটিতে পর্যটকদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে ১২টি নির্দেশনা জারি করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।

দ্বীপের বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এসব বিধিনিষেধের কারণে গত এক বছরে পর্যটন ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি জীবিকার তাগিদে কিছু বাসিন্দার মধ্যে গাছ কেটে ফেলা এবং অবাধে মাছ ধরার মতো পরিবেশবিরোধী তৎপরতাও দেখা গেছে।

এ কারণে সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত এসব বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন বর্তমান সরকারের কাছে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বিধিনিষেধগুলোর মধ্যে যেগুলো যৌক্তিক, সেগুলো বহাল রাখা হতে পারে।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের আকর্ষণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন কয়েক হাজার পর্যটক সেখানে যেতেন।

পর্যটকদের থাকার জন্য দ্বীপটিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল ও রিসোর্ট। সেন্টমার্টিন হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি এম এ আবদুর রহিম জিহাদী জানান, দ্বীপটিতে সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০টি আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব হোটেল-রিসোর্টে অন্তত পাঁচ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১২ দফা বিধিনিষেধে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাস নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটকের রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছিল। আর নভেম্বর মাসে শুধু দিনের বেলায় সেন্টমার্টিন ভ্রমণের অনুমতি ছিল। ওই মাসে রাতে দ্বীপে অবস্থান করা যেত না।

তবে বর্তমান সরকার এই সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক মনে করছে না। ফলে সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপনের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনা চলছে।

পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘যে মানুষটা ছয় বা সাত ঘণ্টা জার্নি করে যাচ্ছে, দুই ঘণ্টা থেকে আবার ছয় সাত ঘণ্টা জার্নি করে কক্সবাজার ফিরছে এটা একেবারেই আনহেলদি প্র্যাকটিস।’

তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি ও আমাদের মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী (আব্দুল আউয়াল মিন্টু) একমত হয়েছি। এটি নিয়ে সক্রিয় আলোচনা করা হচ্ছে, আগের নেওয়া এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে আলোচনা হচ্ছে। যে জার্নি করে যাবে তাকে যদি আমরা রাত্রিযাপনের সুযোগ দেই সেটি ভালো হবে।’

ট্যুর অপারেটরদের সংগঠনও সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপনের বিষয়ে আগের বিধিনিষেধে পরিবর্তন আনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান বলেন, ‘এই রাত্রিযাপন নিয়ে যে নিষেধাজ্ঞা এটাতে পর্যটকরা মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত হয়েছে। কারণ এত টাকা খরচ করে যখন একজন পর্যটক কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনে যাবে, নিশ্চয়ই সে দুই ঘণ্টার জন্য এত দূরের পথ পাড়ি দেবে না। এই সিদ্ধান্তে যেন পরিবর্তন আসে সেটা আমরা চাই।’

অন্তর্বর্তী সরকারের ১২ দফা নির্দেশনা অনুযায়ী, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে সেন্টমার্টিনে রাত কাটানোর সুযোগ ছিল। একই সঙ্গে রাত্রিযাপনকারী পর্যটকের সংখ্যাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল।

বর্তমানে দিনে সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটকের রাত্রিযাপনের অনুমতি রয়েছে। রাত্রিযাপনকারী পর্যটকদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাস দেওয়া হয়।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের নীতিমালা রয়েছে সেখানে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে শুধু দুই হাজার পর্যটক গিয়ে রাত্রিযাপন করতে পারবেন। যারা যাবেন তাদেরকে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এই পাস দেওয়া হয়। যেহেতু বিধি নিষেধে এখনো কোনো পরিবর্তন হয়নি, ওই সংখ্যার বাইরে কোনো পর্যটক সেখানে যেতে পারবেন না এবং অবস্থান করতে পারবেন না।’

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে দীর্ঘদিন ধরে এই পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছিল। হঠাৎ করে এমন নিষেধাজ্ঞার কারণে টুরিস্ট ব্যবসায় বেশ প্রভাব পড়েছে। এটি নিয়ে আমরা আমাদের অভিযোগগুলো পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।’

তবে পর্যটকের সংখ্যা কিংবা ভ্রমণের সময়সীমা আরও বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সেন্টমার্টিনে কোন মাস থেকে কোন মাস পর্যন্ত যাওয়া যাবে, কতজন পর্যটক গিয়ে রাত্রিযাপন করতে পারবেন, সেখানকার ব্যবসায়ীরা কী চান এবং পরিবেশের কতটুকু সীমাবদ্ধতা রয়েছে—এসব বিষয় সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা হবে।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে শুনানি বা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেই বৈঠকে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যসহ সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে একটি গাইডলাইন দেওয়া হবে। সেখানে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি দ্বীপে বসবাসকারী মানুষের স্বার্থও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

সেন্টমার্টিনের ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এর আগে অক্টোবর থেকে মার্চ—এই ছয় মাস দ্বীপটিতে পর্যটকদের ভ্রমণের সুযোগ ছিল। পরে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ভ্রমণের জন্য যে নির্দিষ্ট সময়সীমা করা হয়েছে, তাতে পরিবর্তন চান তারা।

তাদের দাবি, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণের সুযোগ রাখা হোক।

তবে পরিবেশবিদদের কেউ কেউ এ দাবির সঙ্গে একমত নন। পরিবেশবিদ মো. শামসুদ্দোহা বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা করতে হলে দ্বীপটির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা প্রয়োজন। এ জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা দরকার, যা কোনোভাবেই তিন মাসের বেশি হওয়া উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন।

সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আগের বিধিনিষেধের মধ্যে আলোকসজ্জাসহ বারবিকিউ পার্টি, রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো এবং শব্দ সৃষ্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

এ ছাড়া দ্বীপটির কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয় এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ করা হয়।

সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

তবে এসব বিধিনিষেধ পরিবেশ রক্ষায় খুব একটা কার্যকর হয়নি বলে মনে করেন দ্বীপটির জনপ্রতিনিধি ফয়েজুল ইসলাম।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আগের চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। কারণ আগে মানুষ পর্যটক আসতো, পর্যটন নিয়ে ব্যস্ত থাকতো দ্বীপের লোকজন। এখন মাত্র দুই থেকে তিনমাস অল্প পর্যটক আসার কারণে এখন অনেকে গাছপালা কেটে বিক্রি করতেছে, জীবিকার তাগিদে অবাধে মাছ ধরতেছে, এতে পরিবেশের আরও ক্ষতি হচ্ছে।’

তবে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে বর্তমান সরকারও কঠোর অবস্থানে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘সবার আগে এই দ্বীপটিকে সুরক্ষা করতে হবে। এখানকার জীববৈচিত্র্য যাতে সুরক্ষিত হয় সেজন্য আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্লাস্টিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেবো যেন কোনো পর্যটক প্লাস্টিক বা সিঙ্গেল পলিথিন নিয়ে দ্বীপে ঢুকতে না পারে। এটিকে বাস্তবায়ন করতে পরিবেশসহ কোস্টগার্ডের লোক, সবাইকে দায়িত্ব পালন করবে। এগুলো চেক করে প্রত্যেকটা জাহাজ ছাড়বে। কোনো পলিথিন বা প্লাস্টিক উঠতে পারবে না জাহাজে।’

নতুন নীতিমালায় সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি দ্বীপের বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকা এবং পর্যটন ব্যবসার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সরকার।

/এসএন