মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের নেতারা অত্যন্ত ‘শক্তিশালী’ এবং ‘অহংকারী’। এ কারণেই চলমান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে তারা এখনো সম্মত হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে পৌঁছানো ছাড়া ইরানের সামনে অন্য কোনো পথ নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের চিপেওয়া ফলসে শুক্রবার দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ক্রিস্টেন ওয়েলকারের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন ট্রাম্প।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা শক্তিশালী, তারা অহংকারী। এমন কিছু বিষয় আছে, যা তারা কখনো করবে বলে ভাবেনি। কিন্তু এখন তাদের সেগুলো করতেই হবে। তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই, তবে এতে কিছুটা সময় লাগছে।’
চলমান সংঘাতের অবসানে দ্রুত ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য যারা তাঁকে চাপ দিচ্ছেন, তাদেরও সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে (চুক্তি করতে) বছরের পর বছর লেগে যায়।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা চলার মধ্যেই ট্রাম্পের এই মন্তব্য সামনে এসেছে। গত সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাত চতুর্থ মাসে গড়িয়েছে।
এর আগে গত এপ্রিলে উভয় দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল এবং পরে সেই মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় একে অপরকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
ট্রাম্প চলমান সংঘাতের সময়কে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, তিনি অত্যন্ত দ্রুত এগোচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, ভিয়েতনাম যুদ্ধ ১৯ বছর স্থায়ী হয়েছিল, অথচ তিনি মাত্র তৃতীয় মাসে রয়েছেন এবং সবাই জানতে চাইছে, ‘কবে জয় আসবে?’ তিনি বলেন, ‘আমি যদি ডেমোক্র্যাট হতাম, তবে কেউ এভাবে কথা বলতেন না। তবে এতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক বাহিনীকে কার্যত ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে তাঁর মতে, ইরানের হাতে এখনো কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তাদের বেশির ভাগ ড্রোন তৈরির কারখানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, বেশির ভাগ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এলাকাগুলোর বড় অংশও ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু তাদের এখনো কিছু সক্ষমতা আছে। আমি বলব, তাদের হয়তো ২১ থেকে ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো রয়েছে। সেটাও অনেক, তবে প্রথম হামলার সময় যা ছিল, তার তুলনায় এটি কিছুই নয়।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে পারস্য উপসাগরে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে ইরান দেখিয়েছে যে দেশটির এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা রয়েছে। এমনকি কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলা চালানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ট্রাম্প। তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও সাম্প্রতিক সময়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ ছিল প্রয়োজনীয়। তাদের মতে, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধ আগামী সেপ্টেম্বরের শ্রম দিবসের পরও বহাল থাকার সম্ভাবনা কম। নিউইয়র্ক পোস্টের ‘পড ফোর্স ওয়ান’ পডকাস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের নেতাদের সঙ্গে চুক্তি না হলে তাঁকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আমরা কি একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করব, নাকি অন্য পথে হাঁটব? আর সেই অন্য পথটি মোটেও ভালো কিছু হবে না।’
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রতিনিধি পরিষদের আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে সামরিক অভিযান শেষ হয়েছে।
রুবিও বলেন, সপ্তাহের শুরুতে চালানো হামলাগুলো ছিল মূলত আত্মরক্ষামূলক। হরমুজ প্রণালির কাছে বিভিন্ন জাহাজে ইরানের হামলার জবাব হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বাহিনীকে রক্ষা করার জন্য আমরা শুধু ড্রোনগুলোর ওপর হামলা চালাই না, যারা ওই ড্রোন উৎক্ষেপণ করে তাদের ওপরও আঘাত হানি। এগুলো পুরোপুরি আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ এবং ইরানের কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া।’
চলমান সংঘাতের কারণে কয়েক মাস আগেই ইরান তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পায়। এর জেরে অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতাদের ওপরও চাপ বাড়ছে।